ভারতের তৈরি ৫ করোনা ভ্যাকসিন কোন কোন স্টেজে রয়েছে, দেখুন তালিকা

করোনা প্রতিরোধে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বের প্রথম কো-ভ্যাকসিন বাজারে আনার কথা বলে দিয়েছে রাশিয়া। অন্যদিকে ভারতেও তিনটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির করোনা ভ্যাকসিন বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায় আছে। আরও দুই টিকা আছে যা এখনও হিউম্যান ট্রায়াল শুরু করেনি তবে প্রিক্লিনিকাল পর্ব পার হয়ে গেছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ভারতে তৈরি হওয়া এই পাঁচ ভ্যাকসিন সম্পর্কে।

১. জেনোভা বায়োফার্মাসিউটিক্যাল

এই ভ্যাকসিন তৈরি করছে পুণের জেনোভা বায়োফার্মাসিউটিক্যাল যাদের সাথে যুক্ত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটেলের বায়োটেক ফার্ম এইচডিটি বায়োটেকনোলজি কর্পোরেশন।

কিভাবে তৈরি হচ্ছে এই ভ্যাকসিন?

এই ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে আরএনএ (রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) টেকনোলজিতে মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA) সিকুয়েন্সকে কাজে লাগানো হয়েছে এবং HGCO19 ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট ডিজাইন করা হয়েছে।

কতদূর এগিয়েছে প্রস্তুতি?

সম্প্রতি জেনোভা বায়োফার্মাসিউটিক্যাল এর  সিইও সঞ্জয় সিং জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ল্যাবরেটরিতে এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শেষ করেছেন তারা। পশুদের শরীরে এই টিকার প্রভাব বেশ ইতিবাচক। তার কথায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক ও ড্রাগ কন্ট্রোলের অনুমোদন নেওয়ার পড়ে অক্টোবর মাস থেকে এই ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হবে।এই ট্রায়ালের ক্ষেত্রে দুটি ফলে স্বেচ্ছাসেবকদের ভাগ করে তাদের ওপর এই ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হবে। এই দুটি দলের মধ্যে একটি দলের বয়স সীমা হবে ১৮ থেকে ৫৫ এবং ওপর দলের বয়স সীমা হবে ৫৫ থেকে ৭০ বছর। উভয় দলের ক্ষেত্রে আলাদা হবে ভ্যাকসিন এর ডোজ।

২. বায়োটেকনোলজি ই

হায়দ্রাবাদের সংস্থা বায়োটেকনোলজি ই করোনা প্রতিষেধক তৈরির জন্য জনসন অ্যান্ড জনসনের সঙ্গে চুক্তি করেছে।এই কথা ১৩ আগস্ট সংস্থার তরফ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়।এছাড়াও এই বায়োটেকনোলজি সংস্থা ভ্যাকসিনের উৎপাদন ও বিতরণের জন্য জনসনের ফার্মাসি গ্রুপ জ্যানসেন ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

কিভাবে কাজ করবে এই টিকা?

Ad26.COV2.S নামের এই করোনা ভ্যাকসিনের ক্যানডিডেট ডিজাইন করেছে জনসন অ্যান্ড জনসনের রিসার্চ উইং জ্যানসেন ফার্মাসিউটিক্যালস। এক্ষেত্রে বায়োমেডিক্যাল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির উদ্যোগ ছিল। এই করোনা টিকা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই স্পাইক প্রোটিনকে কাজে লাগিয়েই এই ভাইরাস মানব শরীরের কোষের সাথে আটকে সংক্রমন ছড়ায়। এই প্রোটিন স্পাইককেই নিষ্ক্রিয় করে বিশেষ পদ্ধতিতে পিউরিফাই করে তৈরি করা হয়েছে এই ভ্যাকসিনের ক্যানডিডেট।

কতদূর এগিয়েছে প্রস্তুতি?

জানা যাচ্ছে যে ইতিমধ্যেই মার্কিন সরকারের সাথে চুক্তি অনুযায়ী ১০০ কোটি ভ্যাকসিনের ডোজ উৎপাদনের প্রস্তুতি শুরু করেছে জনসন অ্যান্ড জনসন।

৩. সেরাম ইনস্টিটিউট

এই টিকা ভারতে প্রথম লাইসেন্স পায় যখন অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায় ট্রায়াল শুরু হয়। অক্সফোর্ডের ভাইরোলজিস্ট সারা গিলবার্টের টিম এই টিকার (ChAdOx1 nCoV-19) ক্যানডিডেট ডিজাইন করেছেন। এটি একটি ডিএনএ ভেক্টর ভ্যাকসিন যা তৈরি হচ্ছে ব্রিটেনের জেন্নার ইউনিভার্সিটির সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগে। ব্রিটিশ-সুইডিশ ফার্ম অ্যাস্ট্রজেনেকা করোনা প্রতিষেধকের গবেষণার ক্ষেত্রে অক্সফোর্ডের পাশে দাঁড়িয়েছে।

কিভাবে তৈরি হচ্ছে এই টিকা?

এই টিকা তৈরি হচ্ছে ডিএনএ ভেক্টর ভ্যাকসিনের বিশেষ ফর্মুলায়।এটি করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে একটি শিল্ডের মতন কাজ করবে। এটির নাম কোভি শিল্ড। এই টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সেরাম অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রজেনেকার সাথে চুক্তি করেছে।

কতদূর এগিয়েছে প্রস্তুতি?

ইতিমধ্যেই এই ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের নির্দেশিকা দিয়েছে ড্রাগ কন্ট্রোল ও আইসিএমআর। নির্দেশিকা অনুসারে দুটি ডোজে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হবে। স্বেচ্ছাসেবক দের ০ থেকে ২৯ দিনের ব্যবধানে এই টিকার ডোজ দেওয়া হবে।অর্থাৎ প্রথম ডোজ দাওয়ার ২৯ দিনের মাথায় দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। এই সম্পূর্ণ সময় এই স্বেচ্ছাসেবকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং শরীরে কি কি পরিবর্তন হচ্ছে তা দেখা হবে। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সেচ্ছাসেবক দের শরীরে এই টিকা দেওয়া হবে।

৪. ভারত বায়োটেক

এই ভ্যাকসিন তৈরি করছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও পুণের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি (এনআইভি)।

কিভাবে তৈরি হচ্ছে এই ভ্যাকসিন?

সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেন নিয়ে সেটাকে  ল্যাবোরেটরিতে  স্ক্রিনিং করে এই  ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট BBV152 তৈরি করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিন তৈরি করেছে ভারত বায়োটেক।

কতদূর এগিয়েছে প্রস্তুতি?

ইতিমধ্যেই এই ভ্যাকসিনের প্রথম স্তরের ট্রায়াল শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় স্তরের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই টিকা দেশের ১২ টি হাসপাতালে ৩৭৫ জনকে দেওয়া হয়েছে। টিকার কার্যকারিতা ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছে ভারত বায়োটেক। জানানো হয়েছে প্রথমবার ডোজ দেওয়ার পরে এতদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দের এবং এখনও পর্যন্ত তাদের শরীরে কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তাদের সম্প্রতি দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো ‘অ্যাডভার্স সাইড এফেক্টস’ দেখা যায়নি। তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য ইতিমধ্যেই তাদের রক্ত পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে।

৫. জাইদাস ক্যাডিলা

আহমেদাবাদের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি জাইদাস ক্যাডিলা ঘোষণা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেছিল তারা করোনার টিকা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।এই সংস্থার ভ্যাকসিন টেকনোলজি সেন্টার (ভিটিসি) এই ভ্যাকসিনের ক্যানডিডেট ডিজাইন করেছে।

কিভাবে তৈরি হচ্ছে এই টিকা?

এই টিকা ( জ়াইকভ) হলো  প্লাসমিড ডিএনএ ভ্যাকসিন। প্লাসমিড ডিএনএ হল একটি এমন বিশেষ প্রকারের ব্যাকটেরিয়ার এক্সট্রাক্রোমোজোমাল ডিএনএ যার সেলফ-রেপ্লিকেশন। এই ডিএনএ কে কাজে লাগিয়ে বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই টিকা আবিষ্কার করা হয়েছে। মানব শরীরের কোষে এই ডিএনএ বিভাজিত হয়ে ভাইরাল প্রোটিনের অনুরূপ প্রোটিন তৈরি করবে যা শরীরের বি কোষ ও টি কোষকে আরও বেশি সক্রিয় করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটাবে।

কতদূর এগিয়েছে প্রস্তুতি?

১৫ জুলাই থেকে এই ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে যেখানে হাজার জনের বেশী মানুষের শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। জাইদাস ক্যাডিলার চেয়ারম্যান পঙ্কজ আর পটেল জানিয়েছে প্রত্যেকের শরীরেই এই টিকার ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে এবং কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নি। বর্তমানে এই ভ্যাকসিনের  দ্বিতী পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে।