৯১ বছরের “ডাক্তার দিদিমনি” ৪৮ বছর ধরে বিনামূল্যে রোগী দেখেছেন

জীবনের চলার পথ সবার একরকম হয় না সবাই নিজের মতো করে জীবন কাটায়। ১০০ কোটির বেশি এই দেশে কতো মানুষ নিজের মতো করে কাটাচ্ছে তাদের জীবন, কিন্তু কতো জনই তাদের মনে রাখে। তাদের পরিবার, আত্মীয় স্বজন বা গ্রামের বা পাড়ার লোকের কাছেই তারা পরিচিত থাকে তাদের জীবন জুড়ে বা মৃত্যুর পর। কিন্তু এমন কিছু মানুষকে   আজও আমরা মনে রেখেছি যাদের কর্মের দ্বারা আমরা নয় শুধু সমস্ত মানবজাতি উপকৃত হয়েছে। তাদের নিঃস্বার্থ কাজের মাধ্যমে তারা আজ অমর হয়ে রয়ে গিয়েছেন আমাদের হৃদয়ে। তাদের কাছে জীবন মানেই মোটা মাইনের বেতনের চাকরি করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে, পরিবারকে নিয়ে সুখে জীবন কাটানো নয়। তাদের কাছে জীবন মানে তা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। এমনই এক মহিয়সী মহিলার জীবনের কথা আমরা আজ জানবো। যিনি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।

নাম ভক্তি যাদব। এই  মহিয়সী মহিলা কর্মসূত্রে একজন ডাক্তার। তিনি চাইলে আজকের ডাক্তারদের মতো কোটি কোটি টাকা করে বিদেশে গাড়ি বাড়ি কিনে আরাম করে বসবাস করতে পারতেন। কিন্তু তিনি অন্য ধাতুতে তৈরি। আর তাই নিজের বয়স যখন ৯১ এর দোরগোড়ায় তখনও তিনি বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা করে যান অকাতরে। তার জীবনের ৪৮ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে চলেছেন।যেন সাক্ষাৎ মা অন্নপূর্ণার মনুষ্য রূপ।

বাড়ি মধ্যপ্রদেশে। পরাধীন ভারতবর্ষে ১৯২৬ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। আর তাই তিনি বোঝেন ভারতবাসীর স্বাস্থ্য নিয়ে নানান সমস্যার কথা। আর দেশবাসীকে উপকার করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। তিনি ছিলেন একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন একজন প্রখ্যাত মহারাষ্ট্রীয় পরিবারে। সেইসময় বাড়িতে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সেইরকম কোন উচ্চাকাঙ্খা থাকতো না। মেয়েদের বাড়ির মধ্যে রেখেই সাধারণ শিক্ষা দেওয়ার চল ছিল গোঁড়া হিন্দু পরিবারে। কিন্তু সেদিক দিয়ে ভক্তি পেয়েছিল এক প্রকৃত শিক্ষিত পরিবার। ১৯৩৭সালে তিনি যখন প্রাথমিক পড়াশোনা অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণী শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বাবার কাছে মত প্রকাশ করেন তখন তার বাবা তাকে না করেন নি।

তার বাবা তাকে সামনের গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। যেখানে তিনি তার সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা পূর্ন করেন। তারপর তার বাবা তাকে ইন্দোরের সেই সময়কার একমাত্র মহিলা বিদ্যালয় অহল্যা আশ্রম বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন।যেখানে তিনি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। তারপর একাদশ শ্রেণীতে  ১৯৪৮ সালে তিনি  হোলকর বিজ্ঞান মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে তিনি তার BSc ডিগ্রি সম্পূর্ন করেন। তিনি পড়াশোনায় বরবারই মেধাবী ছিলেন। তিনি তার কলেজে প্রথম বর্ষের রেজাল্টে টপার হয়েছিলেন। কিন্তু গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পরও তিনি তার উচ্চ শিক্ষার পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে আসেন নি।কারণ তার মনে স্বপ্ন ছিল দেশের মহিলাদের জন্য কিছু করা। আর তার জন্য সবচেয়ে ভালো মাধ্যম ছিল, মহিলাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া। অর্থাৎ ডাক্তার হয়ে তাদের  উপযুক্ত উপায়ে স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলা। আর তাই তিনি বেছে নেন ডাক্তারি পড়াশোনা।য দিও সেইসময় মেয়েদের ডাক্তারি পড়াশোনা অসম্ভব চাপের এক কাজ ছিল।

প্রথমত বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে হবে।তারপর ডাক্তারি শিক্ষায় যেসব মৃত রোগী নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে হতো তা বেশিরভাগ মহিলার কাছেই ছিল এক অপছন্দের বিষয়। তবুও তিনি এই কঠোর পথকেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি তার একাদশ শ্রেণীর ভালো রেজাল্ট নিয়ে মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল মেডিক্যাল কলেজ স্কুলে ভর্তি হয়ে যান। সেই সময় তার ক্লাসের ৪০ জন ডাক্তারি ছাত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র মহিলা। ১৯৫২ সালে তিনি যখন তার MBBS পাস করে বেরিয়ে আসেন তখন মধ্য ভারতের প্রথম মহিলা ডাক্তার ছিলেন তিনি। এছাড়াও মধ্যপ্রদেশের তিনি প্রথম মহিলা ডাক্তার ছিলেন। তারপর তিনি মানুষের সেবা শুরু করেন। সাত দশকের বেশি সময় ধরে তিনি মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে লক্ষ লক্ষ শিশুর জন্ম দিতে সাহায্য করেছেন দুঃস্থ গর্ভবতী মহিলাকে। যারা মধ্যপ্রদেশের বা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে গিয়েছেন তার কাছে সাহায্যের জন্য বা চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণ করার জন্য।

তবে তিনি রোগীকে কখনোই রোগী হিসাবে দেখেন নি বর্তমান প্রজন্মের ডাক্তারদের মতো। তাদের তিনি নিজের সন্তানদের মতো করে দেখেছেন। আর তাই তার এই সহজাত প্রেম রোগীদের প্রতি সাড়া দিয়েছিল সারা ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের সকল প্রান্তে। তাকে সবাই ভালোবেসে বলতো “ডাক্তার দিদিমনি”।গরীব রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন “সাক্ষাৎ ভগবান”। তার হাতের নরম স্পর্শে গর্ভবতী মহিলাদের প্রসব যন্ত্রনা অনেক অংশেই কমিয়ে দিতেন। তিনি বরাবরই ছিলেন রোগী দরদী। রোগীদের সমস্যার কথা শুনতেন মন দিয়ে, যেন তারা তার পরিবারের একজন। তিনি সবসময় গর্ভবতী মহিলাদের সাধারণ উপায়ে বাচ্চাপ্রসবের উপর জোর দিতেন। তার বৃদ্ধ বয়সে লাঠি হাতে করে করে রোগীদের সামনে গিয়ে তাদের দেখার ভিডিও দেখলে আজও তাকে এক জীবন্ত ঈশ্বর বলে মনে হয়।

তার অসামান্য কাজের জন্য ভারত সরকার তাকে “পদ্মশ্রী”সম্মানে ভূষিত করেন। কাজ পাগল ,রোগী প্রেমী এই মহান নারী ৯২ বছর বয়সে গত বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ১৪ ই আগস্ট আমাদেরকে তার চিকিৎসা পরিষেবা থেকে সারাজীবনের মতো বঞ্চিত করে পরলোক গমন করেন। সত্যিই তিনিই আমাদের বর্তমান প্রজন্মের মানুষের কাছে এক কর্মবীরের প্রকৃষ্ট নমুনা।যাকে দেখে প্রায় সকল মানুষই তার  যা পেশা হোক না কেন, কাজ করার মানসিকতায় অবশ্যই পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে। তার এই নিঃস্বার্থ কাজের নমুনা কি আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে না?আসুন অর্থের পেছনে না ছুটে মানুষকে তার যোগ্য পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করি নিজের নিজের ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ ভাবে। তবেই ড. ভক্তি যাদবের দেখানো পথ আমরা অনুসরণ করতে পারবো এবং আমাদের মানব জীবন ধন্য হবে।