বর্ধমানের মেমারির এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী আজ সারা ভারতের গর্ব

অনুপ্রেরণা যার শ্রদ্ধেয় এপিজে আবদুল কালাম, তার মধ্যে যে বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা থাকবে তা একপ্রকার ধরে নেওয়া যায়। মহান মানুষকে অনুপ্রেরণা হিসেবে সামনে রেখে যারাই তাদের কাজে একাগ্রতার সঙ্গে এবং উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে সেই ব্যক্তিরা সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে সাফল্যের খতিয়ান। আর এমনই এক সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে আমাদের রাজ্যের ক্ষুদে এক বিজ্ঞানী, যে রাজধানী শহর কলকাতার বাসিন্দা না হয়েও সামান্য জেলার ছোট্ট একটা শহরতলীর বাসিন্দা হয়েও তার কাজের মাধ্যমে এবং উদ্ভাবনী শক্তির সাহায্যে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

বর্ধমান জেলার মেমারি পুরসভার সুলতানপুরের বাসিন্দা দিগন্তিকা। বয়স মাত্র ১৫ বছর। এই অল্প সময়ে দিগন্তিকা তার উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে এমন কিছু যন্ত্র যা তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে। বর্তমানে দশম শ্রেণীর এই ছাত্রী তার প্রথাগত শিক্ষার গণ্ডিকে অতিক্রম করে নিত্যনতুন আবিষ্কারের দৌলতে দেখিয়ে দিয়েছে প্রথাগত শিক্ষায় বিরাট কিছু না হলেও কোনো কিছু উদ্ভাবন করার ইচ্ছা যদি মনে কারও আসে তাহলে তা করতে প্রত্যেকে সক্ষম হতে পারে যদি তার সেই আগ্রহ থাকে।

মেমারি রসিকলাল বালিকা বিদ্যালয় এর দশম শ্রেণীর ছাত্রীর বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ এবং নতুন কোন কিছু  করার ইচ্ছা প্রথম প্রকাশ পায় তার তৃতীয় শ্রেণি থেকেই। যখন সে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করার জন্য এক মডেল তৈরি করে বড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। ২০১৭ সালে,” এপিজে আবদুল কালাম ইগনাইট” পুরস্কার জিতে ছিল তার উদ্ভাবনী শক্তিকে এবং বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে।

আলোর প্রতিফলনকে কাজে লাগিয়ে এমন এক চশমা আবিষ্কার করেছিল এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী, যার সাহায্যে চারপাশের ৩১৫ ডিগ্রী দেখা যায় ঘাড়ের বা মস্তিষ্কের কোনরকম নড়াচড়া ছাড়াই। এছাড়াও সহজে গাছে ওঠার জন্য উদ্ভাবন করেছিল এক নতুন ধরনের জুতোর যার সাহায্যে বাঘ বা অন্য কোন হিংস্র পশুর আক্রমণ হলে সহজেই গাছে বা উঁচু স্থানে উঠতে পারবে মানুষ। আর এই আবিষ্কারই তাকে প্রথমবারের জন্য সংবাদ শিরোনাম নিয়ে এসেছিল।

ভারত সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি অধীনস্থ ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া অধিকর্তারা দিগন্তিকা এ আবিষ্কারের কথা জানতে পারে তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে এবং তারা তার এই আবিষ্কার দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। তার এই আবিষ্কারের পিছনের গল্প আরো মজাদার, তার কথায়,”একবার পরিবারের সঙ্গে সুন্দরবন ঘুরতে গিয়েছিল ক্ষুদে বিজ্ঞানী অবন্তিকা। সেখানে সে শুনেছিল বাঘেরা পিছন দিক থেকে মধু আহরণকারীদের বা মৎস্য শিকারীদের আক্রমণ করে তাদের মেরে ফেলে।

আর তাই  সে দেখেছিল মধু আহরণকারীরা বা মৎস্য শিকারীরা  মাথার পিছনে মুখোশ পরে মধু আহরণ করতে বা মৎস্য শিকার করতে যাচ্ছে। আর এই ঘটনা তার মস্তিষ্কে নাড়া দিয়েছিল। তাই সে এমন একটা যন্ত্র বানিয়েছিল যার সাহায্যে পেছনদিকে না ঘুরে পেছনের বস্তুকে বা জীবকে দেখা সম্ভব হয়। আসলে সমস্যার সম্মুখীন হলে সমাধান না খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত খুদে অবন্তিকা শান্তি পায় না মানসিকভাবে। আর এই সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা তাকে পরিণত করেছে এক ক্ষুদে বিজ্ঞানীতে।

এছাড়াও আরো নতুন নতুন আবিষ্কার আছে ক্ষুদে বিজ্ঞানী জীবন্তিকা অবন্তিকার ঝুলিতে। ড্রিল করার সময় মেশিন ঘূর্ণনের ফলে যে ধুলোবালি নির্গত হয় তার ফলে শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুস জনিত রোগের সৃষ্টি হতে পারে আর। তাই এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী অবন্তিকা বানিয়ে ফেলেছে ডাস্ট কালেক্টর যা  ডাস্ট কালেক্টর  অ্যাটাচমেন্ট  ফর ড্রিল মেশিন নামের এক প্রকল্পভিত্তিক কাজ করার সময় সে বানিয়েছিল। যা ড্রিল করা মেশিন এর সঙ্গে লাগানো যেতে পারে, আর তা লাগানো থাকলে ড্রিল করার সময়ও সেই ধুলোবালি বাইরে আর উড়বে না, তা ডাস্ট কালেক্টরে গিয়ে জমা হবে। মাত্র ২৫০ টাকা খরচ করে ড্রিল মেশিনের সঙ্গে এই অ্যাটাচমেন্ট লাগানো যায় সহজেই। এ আবিষ্কার তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সংবাদের শিরোনামে। পরবর্তী সময়ে এই উদ্ভাবনী আবিষ্কারের জন্য “২০১৭ এপিজে আবদুল কালাম ইগনাইট “পুরস্কার পায় সে। বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাকে পুরস্কৃত করেছিলেন।

এছাড়াও বর্তমানে অস্থি জনিত সমস্যা থেকে তৈরি হওয়া রোগ স্পন্ডেলাইসিস সংক্রান্ত এক স্মার্ট বেল্ট বানিয়েছে এই ক্ষুদে বিজ্ঞানী যা “স্মার্ট সার্ভিকেল কলার বেলট”  নামে পরিচিত।  এই বেল্ট একটানা পরলে ব্যথা লাঘব করার সাথে সাথে বেল্ট পরা স্থানে ঘামের সৃষ্টিও হয় না যা থেকে  চুলকানি বা অস্বস্তিও তৈরি হয় না। ঠাকুরমা লক্ষ্মীপ্রিয়া বসুর স্পন্ডেলাইসিস  থেকে পাওয়া কষ্ট থেকে এরকম একটি বেল্ট আবিষ্কার করতে উদ্ভূত হয়েছিল বলেই জানাই ক্ষুদে বিজ্ঞানী অবন্তিকা।

আর এই আবিষ্কারের জন্যই ২০১৮ “এ পি জে আবদুল কালাম ইগনাইট’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে সে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ জাতীয় ইনোভেটিভ ফাউন্ডেশন দেশের খুদে ৩১ জন বিজ্ঞানীকে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করেছে সংবাদ মাধ্যমে। সেই তালিকায় রয়েছে আমাদের  বাংলার গর্ব  এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ও ক্ষুদে বিজ্ঞানী দিগন্তিকার নামও। ইতিমধ্যে ফাউন্ডেশনের চিঠি হাতে পেয়েছে সে ও তার পরিবার।  দিগন্তিকার এই সাফল্যে আনন্দিত প্রতিবেশীরাও।

এক কথায় গর্ব হয় ক্ষুদে বিজ্ঞানী অবন্তিকার সাফল্য দেখে। আর মেয়েরাও যে কোনো অংশে কম নয় তা যেন তার কাজের মাধ্যমে সকলের সামনে তুলে ধরে খুদে অবন্তিকা। তাই বাংলার কন্যাশ্রী সারা ভারত ছাড়িয়ে বিশ্বের আঙিনায় নিজের নামের সাথে সকল নারী জাতিকে গর্বের এক সুযোগ করে দিয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নিত্য নতুন সমস্যা দেখে তা সমাধান করার ইচ্ছা  তৈরি করে বিজ্ঞানীকে ।তাই এরকম বিজ্ঞানী হওয়ার ক্ষমতা আছে অনেকর মধ্যেই আছে। আমাদের সকলকে তাদের সেই উদ্যমকে ফিরিয়ে দিতে হবে বা তৈরি করতে হবে সেই মানসিকতা যা তৈরি করবে বাংলার ঘরে ঘরে এরকম ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের।