কত রূপে পূজিত হন মা কালী, দেখে নিন মায়ের বিভিন্ন রূপ

সামনেই কালীপুজো। অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির জয়ের এই উদযাপনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে বাঙালিরা। হিন্দু শাস্ত্র মানতে, শক্তির প্রতীক মায়ের এই রূপ। তন্ত্রমতে মা কালী (Kali) দশমহাবিদ্যা।এই দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপ পুজিত হয় কালী নামে।

শাক্ত (শক্তির উপাসক)দের মতে, মা কালীই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করেছেন। তন্ত্র অনুসারে বিভিন্ন রূপে পূজিতা হন মা কালী। এক বিশেষ তন্ত্রমতে,মা কালী অষ্টধা,অর্থাৎ তার আটটি রূপ আছে যেগুলি হলো দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী,গুহ্যকালী,মহাকালী,ভদ্রকালী, চামুন্ডাকালী, শ্মশান কালী এবং শ্রীকালী। মুলত এগুলো গাহস্থ্য ও সাধন অধিষ্ঠাত্রী নাম মিশ্রিত। তবে ধারাক্রমে বিভিন্ন তন্ত্র শাস্ত্র ও পুরানমতে ক্রমানুক্রমে কালীরগাহস্থ্য (সমাজে প্রচলিত রুপ) রুপধারা গুলো হলো নিম্নরূপ।

মা দক্ষিণাকালী :- 

কালীর সবথেকে প্রসিদ্ধ ও জাগ্রত রূপ মনে করা হয় দক্ষিণাকালীর এই রূপকে।তার এই নামের ব্যাখ্যায় শাস্ত্রে বলা হয়েছে,দক্ষিণ দিকের অধিপতি যমরাজ(যিনি জীবন হনন করেন) কালীর এই রূপের ভয়ে পালিয়ে যান। এই কালীর গলায় ঝোলে মুন্ডমালার হার, তিনিই মুন্ডুমালা বিভূষিতা।

ত্রিনয়নী দক্ষিণাকালীর বাম দিকের দুই হাতে তিনি ধরে থাকেন সদ্যকাটা নরমস্তক। দুই ডানহাতের একটিতে তিনি ভক্তদের বর দেন এবং অপরটিতে অভয়।তার ডান পা মহাদেবের বক্ষে স্থাপিত থাকে। তিনিই রামপ্রসাদের “কালো রূপে দিগম্বরী শ্যামা মা”।

রক্ষাকালী :- 

রক্ষাকালী দক্ষিনাকালীর একটি নাগরিক রুপ।প্রাচীন কালে নগর বা লোকালয়ের রক্ষার জন্য এই দেবীর পুজা করা হতো। এই দেবীর পুজা মন্ত্র ভিন্ন এবং ইনার বাহন স্থানভেদে সিংহ।

কাম্যকালী :- 

আমাদের বিশেষ কামনায় বা বিশেষ প্রার্থনায় যে কালীপুজা আয়োজন করা হয়, তাকেই কাম্যকালী পুজা বলা হয়, পুজা বিধি দক্ষিনাকালীর মতই।সাধারনত অষ্টমী, চতুর্দ্দশী অমাবস্যা পুর্ণিমা ও সংক্রান্তিকে পর্বদিন বলে।পর্বসমুহের মধ্যে অমাবস্যাকে বলা হয় মহাপর্ব। বিশেষ কামনায় এই সকল তিথিতে যে পুজা করা হয় তাকেই কাম্যকালী পুজা বলা হয়।

সিদ্ধকালী :- 

কালীর এই রূপের আরাধনা করেন তন্ত্রসাধকরা। মায়ের এই রূপ সালংকারা অর্থাৎ গয়না পরিহিতা।গৃহস্থ বাড়িতে দেবীর এই রূপের পুজো হয়না।

গুহ্যকালী :- 

শাস্ত্রে কালীর এই রূপকে ভয়ংকরী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।তিনি সাধকদের আরাধ্যা।দিভূজা এই দেবীর গায়ের রং কালো মেঘের মতন গাঢ় এবং লোলজিহ্বা।এই দেবীর গলায় ৫০টি নরমুন্ডের হার এবং কানে শবদেহের আকারের অলংকার এবং কোমরে ছোট কাপড়।

মহাকালী :- 

মা কালী এই রূপের দুটি মত আছে যার একটি (তন্ত্রসার গ্রণ্ঠমতে) অনুসারে এই রূপের ৫টি মুখ এবং ১৫ টি চোখ আছে।শ্রী শ্রী চণ্ডী মতে, আদ্যাশক্তির ১০ মুখ, হাত, পা এবং ৩০০ চোখ আছে।শাস্ত্রমতে,মা কালী এই রূপে সাধনার পূর্বে ভক্তকে ভয় দেখান কিন্তু সেই ভয়কে জয় করে যদি ভক্ত সাধনায় ভরসা রাখতে পারেন তবে মা কালী তাকে সৌভাগ্য,রূপ এবং শ্রী প্রদান করেন।

ভদ্রকালী :-

ভদ্র শব্দটি ব্যাবহার করা হয়েছে কল্যাণ হিসেবে এবং কালী শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে জীবনের শেষ সময় বোঝাতে। কালী এই রূপে ভক্তদের মরণকালে কল্যাণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্গা ও সরস্বতীর ওপর নাম হিসেবেই এই নামটি ব্যবহৃত হয়।

কলিকাপুরান অনুসারে তার গায়ের রং অতসী ফুলের মতন এবং তার কপালে অর্ধ চন্দ্র বিরাজ করে এবং তার মাথায় থাকে জটা।তিনি গলায় পড়ে থাকেন কণ্ঠহার।তবে তন্ত্র মতে তার রূপের ব্যাখ্যা আলাদা। তন্ত্র মতে,ভদ্রকালী কৃষ্ণবর্না, কটরাক্ষী এবং মুক্তকেশী।এই মত অনুসারে ভদ্রকালীর হাতে থাকে আগুনের শিখা।

চামুণ্ডা কালী বা চামুণ্ডা :-

দেবী ভাগবত পুরাণ এবং মারকেন্ডিয় পূরণ অনুসারে চন্ড ও মুন্ড নামে দুই অসুর বধের উদ্দেশ্যে দেবী দুর্গার ভ্রুকুটি থেকে এই দেবীর সৃষ্টি হয়।ভাগবত পুরাণ অনুসারে এই দেবী ব্যাঘ্র চর্ম পরে থাকেন এবং দেবী অস্তিচর্মসার।দেবীর দন্ত বিকট।চণ্ডী পুরাণ অনুসারে দেবী চণ্ডীর ৮ রকম ব্যাখ্যা এবং মন্ত্র আছে।

শ্মশান কালী :-

এই দেবী শ্মশানে অধিষ্ঠিতা।গৃহস্থ বাড়িতে এই দেবীর পুজো হয় না।প্রাচীনকালে ডাকাতরা এই দেবীর আরাধনা করতো।কবি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “দেবী চৌধুরানী” উপন্যাসে এই দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

শ্রী কালী :-

অনেকে মনে করেন এই রূপে দেবী দারুক নামে অসুরের বধ করেছিলেন।এই দেবীর রূপ নিয়ে কথিত আছে,তিনি মহাদেবের কণ্ঠে প্রবেশ করে তার কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্না হন এবং পরবর্তীকালে মহাদেব শিশু রূপে তার স্তন্যপান করে দেবীর শরীর থেকে বিষ গ্রহণ করেন।

ফলহারিনী কালী :- 

গৃহ ধর্মকে সুন্দর করতে এই দেবীর আবির্ভাব, নামে ফলহারিনী হলেও অভিষ্ট সিদ্ধ দায়িনি,জানা যায় রামপ্রসাদ নিজ স্ত্রীকে এই দিন দেবীরুপে পুজা করে নারী জাতীর সম্মানের জন্য এর ফল উৎসর্গ করেন।এটিও বাৎসরিক একটি পুজা।