সকালে কফি? রাত্রে ফল? খালি পেটে কি খাবেন আর কি নয়?

আমাদের আজকের ব্যস্ততার জীবনে সবচেয়ে বেশি সমস্যা আমাদের যা ভোগাচ্ছে তা হল আমাদের খাদ্যাভ্যাস। আজ বলতে কোন দ্বিধা নেই, প্রত্যেকের জীবন খুবই ব্যস্ত। দিনের শেষে সময় ২৪ ঘন্টা হলেও কাজের লম্বা ফর্দ। তাই সময়মতো না হয়ে ওঠে খাওয়া দাওয়া আর না হয়ে ওঠে পর্যাপ্ত ঘুম। প্রত্যেকের জীবনে নানা দুশ্চিন্তা। কারো দুশ্চিন্তা নিজের কেরিয়ার নিয়ে, তো কারো আবার ছেলে মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে। এছাড়াও প্রত্যেকের কাজের চাপ। নানা দিক দিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে একপ্রকার ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছি। আর এর জন্য দায়ী আমাদের আকাঙ্খা। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক সাফল্য আমাদের পেতে হবে। তাই খাবার নিয়ে আমরা বেশি কিছু ভাবি না। কোন খাবার খাচ্ছি , আর কখন খাচ্ছি তাও দেখি না। তাই কাজের শেষে রাত দশটায় কফি খেয়ে পেটের যেমন বারোটা বাজাচ্ছি, তেমনি রাস্তার ফাস্টফুড খেয়ে ডেকে আনছি নানান সমস্যা।

আসলে আমাদের খাবার গ্রহণ এবং খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা নেই। যে যা বলে তাই একপ্রকার শুনে নিয়ে বা টিভিতে নানা বিজ্ঞাপন দেখে আমরা প্রভাবিত হই। কিন্তু শরীরের নানা প্রকার সমস্যা তা হজমের হোক বা কোষ্ঠকাঠিন্য বা রক্তচাপের সমস্যা সবকিছুই আমাদের ভুল খাদ্যাভাসের ফল। তাই আজকের প্রতিবেদনে আমরা আপনাদের এমন কিছু ভুল ধারনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে আপনাদের খাদ্য এবং তার গুনাগুন সম্পর্কে সচেতন করবো।

সকালে খাও রাজার মতো, রাত্রে খাও প্রজার মতো

আমরা অনেককেই বলতে শুনি, সকালের খাবার রাজার মতো খেতে হয়  অর্থাৎ বেশি বেশি এবং পরবর্তী সময়ে দুপুরে তার পরিমান যুবরাজের মতো এবং রাত্রিতে প্রজার মতো খাবার খাওয়া উচিত।এর সত্যতা কতটা আছে ,এর নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন আছে।

তবে এর সত্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সাধারণত আমরা যখন সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ গ্রহণ করি তার আগে ৭ঘন্টার মতো সময় আমরা রাত্রে ঘুমে কাটাই। অর্থাৎ সেই সময় আমরা কোনকিছু না খেয়ে থাকি। তাই একটানা অনেকক্ষন না খেয়ে থাকার ফলে আমাদের খিদে থাকে। তাই দিনের প্রথম খাবার পুষ্টিযুক্ত এবং উপযুক্ত পরিমাণের হওয়া উচিত। তাই সুষম খাদ্য এবং অন্যান্য সকল পুষ্টিকর উপাদান যুক্ত খাদ্য সকালের প্রাতরাশে থাকা উচিত। তাই স্বাভাবিক কারণেই খাবারের পরিমান বেশি থাকা উচিত।

আর যেহেতু রাত্রি হওয়ার  সাথে সাথে আমাদের দৈহিক পরিশ্রমের কাজ এবং অন্যান্য কার্যকলাপের পরিমান কমে যায় তখন তাই শক্তির পরিমান কম লাগে, তাই রাত্রের খাবার কম খেতে বলা হয়। কারন অতিরিক্ত খাদ্য এইসময় গ্রহণ করলে তা আমাদের শরীরে ব্যবহৃত না হয়ে চর্বি রূপে কোমরে, ঘাড়ে এবং তলপেটে জমতে শুরু করে। তাই ভুলেও রাত্রে বেশি খাবেন না। আসলে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে আমরা সকাল বেলায় খুব কম খাবার খেয়ে থাকি। বড়জোর একটা কলা, একটা ডিম, একটা ওমলেট, দুটো ব্রেড জ্যাম দেওয়া। আর তারপর দুপুরে করি ভুরিভোজ এবং রাত্রেও চলে ভারী তেলমশলা যুক্ত খাবার। যার ফলে আমরা শতকরা ৯০জনই আমাদের শরীরের গঠন নিয়ে সন্তুষ্ট নই।

নির্জলা উপবাস, কতোটা স্বাস্থ্য সম্মত?

উপবাস করা নির্ভর করে আপনার শরীরের খাদ্য প্রয়োজনীয়তার উপর। সাধারণত বাড়ির মহিলা যারা উপবাস করে বিভিন্ন পূজার জন্য তারা উপবাস করার সময়ও বাড়ির  যাবতীয় কাজ করে থাকে। এর ফলে তাদের পরিশ্রম হয়, কিন্তু শরীরের চাহিদা মতো খাবারের জোগান পাওয়া যায় না, ফলে শরীর দ্রুত অসুস্থ হয়ে ওঠে। তাই উপবাস কালে কোনও ভারী কাজ না করাই উচিত। যদি একান্তই করতে হয় তাহলে কম পরিশ্রম যুক্ত কাজ করুন।কিন্তু নির্জলা উপবাস একপ্রকার না করাই উচিত।কারন এর ফলে শরীরের প্রয়োজনীয় জলের জোগান বজায় থাকে না।তাই এক্ষেত্রে অনেকের শরীর দ্রুত খারাপ হতে পারে।তাই নির্জলা উপবাস না করাই স্বাস্থ্য সম্মত।এমনিতে যাদের স্বাস্থ্যের সমস্যা নেই তারা সপ্তাহে একদিন ভারী খাবার না খেয়ে থাকতেই পারেন তাতে শরীরের বিপাক কাজ বৃদ্ধি পায়।

ফল খাওয়ার আদর্শ সময় কখন?

ফল সাধারণত  একদমই খালি পেটে খাওয়া উচিত নয়। কারন বিভিন্ন ফলে নানা জৈব আসিড থাকে। আর আমাদের পাকস্থলীতে এমনিতেই প্রতিদিন আসিড তৈরি হয়। তাই আমাদের শরীরে আসিডের পরিমান বৃদ্ধি পায়। তাই অম্ল এবং ক্ষারের ভারসাম্য নষ্ট হয়।তাই সকালের প্রাতরাশ করার এক ঘন্টা বা দুই ঘণ্টার সময়ের মধ্যে ফল খাওয়া  যেতে পারে।বা দুপরের ভারী খাওয়ার খাওয়ার দুই ঘণ্টার পর খাওয়া যেতে পারে।সাধারণত বিকালের দিকে ফল খেলে পেট ভর্তি থাকে তাই ফাস্টফুড খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায় বা থাকে না। কিন্তু ফল সাধারণত সন্ধ্যা ৬ টা বা তার পরবর্তী সময়ে বা রাত্রির সময় খাওয়া একদমই উচিত নয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার বা পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নিজের সময় মতো ফল খেতে পারেন।

ওজন কমানোর সহজ উপায় ?

শরীরের ওজন সাধারণত তিন ভাবে বাড়ে। এক শরীরের  প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়া। দুই নিজেকে কোনরকম শরীর চর্চার মধ্যে না রাখা। সাধারণত আমাদের খাদ্যাভ্যাস। তাই আমাদের কী খাওয়া হচ্ছে সেটা অবশ্যই দেখতে হবে।আর প্রতিদিন বা সপ্তাহে একদিন পর পর অবশ্যই সাধারণ কিছু ব্যায়াম যেমন সকালে হাঁটা অবশ্যই গতি রেখে।এছাড়াও খালি হাতের কিছু ব্যায়াম করতে পারেন।তার জাঙ্কফুড খাওয়ার আগে অবশ্যই দেখবেন আপনার খিদের চাহিদা কেমন ,সেই পরিমানে খান।জাঙ্কফুডে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ক্যালোরি  থাকে।তাই ভেবেচিন্তে, বুঝে  খাবার খান।আর কমবয়সীরা অবশ্যই ব্যায়াম এবং পারলে জিমে যান।তাহলে শরীর একটা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে থাকবে।তাই দ্রুত ওজন কমবে।

বসে ওজন কমার উপায়

সাধারণত আজকের দিনের বেশিরভাগ কাজ শীততাপ বা এমনই চেয়ারে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করা বা খাতা পত্র লেখালেখির কাজ। এইসব কাজের সাথে যারা যুক্ত থাকে তাদের জন্য সবচেয়ে ভাল হল, একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর চেয়ার ছেড়ে হালকা হাঁটাচলা করা।সাধারণত এটা আধ ঘন্টায় একবার করলে ভালো হয়।তাছাড়া বসে না থেকে পারলে দাঁড়িয়ে কাজ করুন।যদি নিজের কাজের জায়গা এমনভাবে বানাতে পারেন যাতে আপনার সমস্ত কাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করতে পারেন তাহলে অনেক বেশি সুষ্ঠ থাকবেন এছাড়াও লিফ্ট ব্যবহার বন্ধ করে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।বেশি চা খাবেন না।যেহেতু দৈহিক পরিশ্রমের পরিমান কম, তাই খাবার খান শরীরের যতটা প্রয়োজন।পারলে পেটে খিদে থাকুক অল্প।কিন্তু তেলমশলা যুক্ত খাবার কম খান বিশেষ করে অফিস আওয়ারে।আর বাড়ি যাবার সময় একটু হাঁটুন।হয়তো সময় একটু বেশি খরচ হবে।কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন থেকে শুরু করলে আপনার শরীরে যেমন মেদ জমবে না ,তেমনি নানা রোগ থেকে মুক্তি পাবেন যেমন ডায়াবেটিস ,ওবেসিটি ইত্যাদি।

মাল্টিভিটামিন্স ট্যাবলেট নেওয়ার যুক্তি

সাধারণত শরীরের প্রয়োজনে আমরা খাবার খেয়ে থাকি ।পুষ্টিকর খাবার থেকেই আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয়  উপাদান পেয়ে যাই।কিছু ক্ষেত্রে শরীর যখন সেই খাদ্য থেকে দরকারি  উপাদান নিতে পারে না বা আমাদের লাইফস্টাইলের জন্য আমরা পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ার সময় বা অভ্যেস থাকে না তখন ডাক্তার বা পুষ্টিবিদরা আমাদের মাল্টিভিটামিন্স ট্যাবলেট খেতে পরামর্শ দেয়।তাই দরকার পড়লেই খাওয়া উচিত ।নিজে থেকে প্রেসক্রিপশন করে ,বা ওষুধের দোকানের চেনা লোকের  পরামর্শে খাবেন না।

ভাত খেলে কী শরীরে মেদ জমে?

সাধারণত আমরা যারা বাঙালি তাদের প্রধান খাদ্যই হল ভাত, তাই ভাত খাওয়ার সঙ্গে মেদ বাড়ার যে বিরাট কিছু সম্পর্ক আছে তা কিন্তু নয়।তবে পরিমান মতো খেতে হবে।ভাত সাধারণত শক্তি উৎপাদক খাদ্য।কারন এর মধ্যে বেশিরভাগই থাকে শর্করা।তাই যারা দৈহিক পরিশ্রমের কাজের সাথে বেশি করে যুক্ত তাদের ভাতের পরিমান একটু বেশি থাকবে।না হলে ১০০গ্রাম চালের ভাত একজন পূর্ন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট।তবে আগেই বলেছি পরিশ্রম অনুযায়ীই আপনাকে ভাত খেতে হবে।আর একবেলা ভাত খাওয়াই শরীরের জন্য উপযুক্ত।কারন শরীরের প্রয়োজন ছাড়াই বেশি খাবার আমাদের খাদ্য হজম করতেও অসুবিধা সৃষ্টি করে।

কফি কখন খাবেন?

সাধারণত আমরা সকালে খালি পেটেই অনেকে কফি খেয়েথাকি।কিন্তু কফি খালি পেটে না খাওয়াই ভালো।কফিতে থাকা ক্যাফিন আমাদের কাজে উত্তেজনা বাড়াতে সাহায্য করে।তাই কাজের সময় কফি চলতে পারে।কিন্তু রাত্রে ঘুমানোর আগে, বা গভীর রাতে জেগে কাজ করলে কফি না পান করাই উচিত।কফি সাধারণত প্রাতরাশ নেওয়ার সময় এবং অন্যান্য সময়ে নেওয়া যেতে পারে।তবে সারাদিনে তিন থেকে চার বারের বেশি যেন না হয়।সাধারণত কফি খেলে ক্ষুধামন্দা দেখা যায়।তাই এটা বেশি অভ্যাসের মধ্যে না রাখাই উচিত।এছাড়াও অতিরিক্ত কফি পানের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা যায়।

উপরের বর্ণিত সকল পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডেলনাজ চান্দুবাদিয়া, যিনি বর্তমানে মুম্বাইয়ের যশলোক হাসপাতাল এবং রিসার্চ সেন্টারের সাথে যুক্ত।