ফ্রীজের মাধ্যমে কি করোনা ভাইরাস ছড়ায়? কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা

করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষের আশঙ্কার শেষ নেই। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে ফ্রিজের মধ্যেই নাকি বাসা বাঁধতে পারে করোনা ভাইরাস! রোজকার খাবার থেকে ডিম, মাখন, দুধ দই সবকিছুই যে থাকে ওই ফ্রিজে। ফলে সকাল সকাল অনেক বাড়িতেই পড়ছে ফ্রিজ পরিষ্কার করার ধুম।

বাংলার এক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম তাদের একটা প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, লকডাউনের পর এক পরিবারের কেউ বাইরে বার হননি, অথচ তাঁদের সবার করোনা হয়েছে। জীবাণুর উৎস খুঁজতে গিয়ে চোখ পড়েছে ফ্রিজে। ফ্রিজ খোলা-বন্ধ করার সময়ই নাকে-মুখে বা চোখে ঢুকেছে করোনা। শাক-সব্জি, মাছ-মাংসে লেগে সে নাকি ফ্রিজের ঠান্ডায় জমিয়ে বসেছিল। গ্লাভস না-পরা হাতে সে লেগে, সেই হাত নাকে-মুখে বা চোখে লেগে জীবাণু সংক্রমণ ছড়িয়েছে। তারপর পুরো পরিবারে ছড়িয়েছে সংক্রমণ।

ফ্রীজের মাধ্যমে কি করোনা ভাইরাস ছড়ায়?

ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অমিতাভ নন্দী আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, ফ্রিজের মধ্যে ভাইরাস থাকতেই পারে একমাত্র যদি সেই ফ্রিজের তাপমাত্রা -১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। তবে এটা কোনোভাবেই বাড়ির ফ্রিজে সম্ভব নয়। ভাইরাস গবেষণার ল্যাবে লিকুইড নাইট্রোজেনের সাহায্যে ফ্রিজের তাপমাত্রা কমিয়ে সেই ঠান্ডায় ভাইরাস সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতির নাম হলো ক্রায়ো প্রিজারভেশন। যখন প্রয়োজন হয় তখন সেই ভাইরাসকে বাইরে বার করে আনা হয় এবং ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় এলে ভাইরাস পুনরায় জ্যান্ত হয়।

সেখানে ঘরের ফ্রিজারের তাপমাত্রা হয় ০ থেকে -২/-৩ ডিগ্রি এবং ফ্রিজের ৪-৮/১০ ডিগ্রি। তিনি বলেন এই তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাসের জীবন্ত থাকা নিয়ে কোনো গবেষণার কথা তিনি শোনেননি। তিনি উল্টে প্রশ্ন করেন, যদিও ভাইরাস জ্যান্ত থাকে তবে তা কি ফ্রিজ থেকে লাফিয়ে নাকে মুখে যদি যায়? ঢুকলেও কিভাবে তার ঢোকা সম্ভব?  ফ্রিজের তাপমাত্রা থেকে লাফ দিয়ে শরীরে ঢুকলেও ভাইরাসের বেঁচে থাকা বা বংশবৃদ্ধি কিভাবে সম্ভব?  তিনি বলেন এরকম ভুল তথ্য প্রচার করে মানুষকে অযথা আতঙ্কিত করা কখনোই ঠিক না।

ফ্রিজে রাখা খাবার থেকে করোনা সংক্রমণ সম্ভব?

অমিতাভ বাবু বললেন, এটা তখনই সম্ভব যদি সুস্থ ব্যাক্তির হাত দেওয়ার ঠিক আগে কোনো করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যাক্তি সেটাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করেন এবং সেটা স্পর্শ করার ঠিক পরে সুস্থ ব্যাক্তি চোখে মুখে বা নাকে হাত দেন। তিনি আরও জানান যে একজন সুস্থ মানুষকে করণ আক্রান্ত করতে অনেক ভাইরাস প্রয়োজন। কয়েকটা ভাইরাস একজন সুস্থ মানুষকে করোনা আক্রান্ত করতে পারে না।

তবুও সাবধানের মার নেই। তাই আমরা বাজার থেকে যাই কিনি না কেন, ফ্রীজ ঢোকানোর আগে সেগুলো ভাল ক্রোয়ে ধুয়ে নেওয়া উচিত। তবে ফ্রীজ খোলার সময় মাস্ক বা গ্লাভস বা চশমার কোনো প্রয়োজন নেই। করোনা ভাইরাস ফ্রিজ থেকে লাফ দিয়ে চোখে মুখে ঢুকবে না। তার কথায় ঘরের ফ্রিজের তাপমাত্রায় ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারেনা।

করোনা  হয়েছে এমন মানুষ হাঁচলে-কাশলে তাঁর লালা-থুতুর সঙ্গে যে ভাইরাস বেরোয় তাতে ভাইরাস জীবিত থাকে। খুব কম দূরত্ব থেকে তা সরাসরি নাকে-মুখে ঢুকলে সংক্রমণ হতে পারে। কিন্তু কোনও জীবিত শরীর ছাড়া ভাইরাস বেশিক্ষণ বাঁচতে পারে না। কাজেই সেই লালা-থুতুর কণা যেখানে পড়ে সেখানে ভাইরাস খানিকক্ষণই কেবল বেঁচে থাকে। এবার সেই খানিকক্ষণের মধ্যে সেখানে হাত দিলেন, হাতে ভাইরাস লাগল, তারপর সে হাত নাকে-মুখে লাগালেন, তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাইরাস শরীরে ঢুকল, এই এত কিছু সব ঠিকঠাক হলে তবে সংক্রমণ হবে।

কিন্তু আমরা যে শুনি, এখানে ভাইরাস এতক্ষণ বাঁচে, সেখানে ততক্ষণ বাঁচে, এর বেশিরভাগটাই গবেষণাগারে প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে গবেষণাগারে যা ঘটে, বাস্তব জীবনেও একেবারে ঠিক তাই তাই ঘটবে, এমন কিন্তু নয়! গবেষণাগারে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, তাপমাত্রায় করনা ভাইরাস যেরকম পতিক্রিয়া দেখাবে, বাস্তবের মাটিতে সেই সমান পতিক্রিয়া সে দেখাতে পারবে না।

গবেষণাগারে কিভাবে পরীক্ষা হয়?

কোনও বস্তুর ওপর ভাইরাস কতক্ষণ জীবিত থাকতে পারে তা গবেষণাগারে পরীক্ষা করার সময় গবেষকরা কালচার মিডিয়াম থেকে এক ফোঁটা ভাইরাস সেই বস্তুর ওপর ফেলে নির্দিষ্ট সময় পর পর তার নমুনা নিতে থাকেন। সেই পরীক্ষা থেকেই জানা যায় ভাইরাস কোনও পদার্থের ওপরে কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে। তবে এই পরীক্ষা থেকে এটি স্পষ্ট হয়না যে সেখানে হাত দিয়ে সেই হাত চোখে মুখে লাগালে ভাইরাস সসংক্রমণ ঘটবে কিনা।

এর মূল কারণ ভাইরাসের সংখ্যা। কালচারে খুব বেশী পরিমাণে ভাইরাস থাকে এবং ড্রপলটে তার থেকে অনেক কম থাকে। তার মধ্যে পরিস্থিতি অনুসারে সব ভাইরাস সম্পূর্ণ সময় বাঁচে না এবং যে পরিমাণ ভাইরাস বাঁচে তা চোখে বা মুখে লাগল সসংক্রমণ হবে কিনা তাও বলা যায়না।

আরও পড়ুন :- বাতাসের মাধ্যমেও ছড়াচ্ছে করোনা, সংক্রমণের থেকে বাঁচতে ৬টি টিপস

অর্থাৎ কত পরিমাণ ভাইরাস আছে তার ওপর নির্ভর করে এবং তা কতক্ষণ পর শরীরে যাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। ফ্রিজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তার ওপরই নির্ভর করে। ডক্টর নন্দীর কথায় যেকোনও ভাইরাস সসংক্রমণ বিশেষ করে করোনা সসংক্রমণ প্রক্রিয়া খুব জটিল প্রক্রিয়া। এখানে সম্পূর্ণ বিষয়টিই অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।