কীর্তন দলে বাজাতেন তবলা, আজ বলিউডের জনপ্রিয় গায়ক, দুর্গাপুরের মিকা বাংলার গর্ব

Mika Singh Life Story

বলিউডের (Bollywood) প্রখ্যাত গায়ক (Singer) হিসেবে আজ মিকা সিংকে (Mika Singh) সারা ভারতবর্ষ চেনে। তবে জানেন কি আজ সারা বলিউড ইন্ডাস্ট্রি যার গানে মুগ্ধ, আদতে তিনি পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের বাসিন্দা? এই বঙ্গসন্তান দুর্গাপুর থেকে সোজা বলিউডে গিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছেন। সমগ্র বলিউডকে নিজের সুরের জাদুতে মাতিয়ে রেখেছেন। এই মুহূর্তে ভারতের প্রথম সারির গায়কদের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তবে দুর্গাপুর থেকে মুম্বাই পর্যন্ত তার এই সফর কিন্তু খুব একটা সহজ ছিল না।

মিকা সিং এর আসল নাম অমৃক সিং। তার জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে। একসময় বেনাচিতির গুরুদোয়ারার গ্রন্থী বা পুরোহিত ছিলেন গায়ক মিকা সিংয়ের বাবা। তাঁর জন্মস্থান এই গুরুদোয়ারা প্রাঙ্গণ। মন্দিরের পিছনে গুরুদোয়ারার গ্রন্থীদের বাসস্থান। আর এখানেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মিকা সিংয়ের। তারপর চার বছর বয়সে দিল্লি চলে যান মিকা সিংয়ের পরিবার। আর সেখান থেকেই পড়াশোনা এবং আজকের গায়ক মিকা সিং হয়ে ওঠা। ছোটবেলাকার চরম অর্থকষ্টে কেটেছে মিকার। ৬ সন্তানকে প্রতিপালন করার মতো যথেষ্ট সামর্থ ছিল না তার পরিবারের।

ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না মিকা। পড়াশোনার বদলে গানের প্রতিই তার আগ্রহ ছিল বেশি। পঞ্চম শ্রেণি অব্দি পড়েই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দিয়ে গানের প্রতি মনোনিবেশ করেন তিনি। গান বাজনার প্রতি তার আগ্রহ এসেছে তার বাবার থেকেই। শাস্ত্রীয় সংগীতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল মিকার বাবার। প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করতেন। বাবার রেওয়াজ শুনেই প্রতিদিন ঘুম ভাঙতো তার। বাবাই ছিলেন সংগীতে তার প্রথম শিক্ষাগুরু।

ছোট থেকেই তিনি খুব ভালো তবলা বাজাতে পারতেন। বাবার সঙ্গে পটনা সাহিব গুরুদ্বারে কীর্তনের মাঝে তবলা বাজাতেন মিকাসহ তার ৫ ভাই। কীর্তন দলে গান গেয়ে ১০০ টাকা পারিশ্রমিক পেতেন তারা। মিকার দাদা মেহেন্দিও গান গাইতেন। তিনি একটি ব্যান্ড গড়ে তুলেছিলেন, সেই ব্যান্ডের দৌলতেই গিটার শিখেছিলেন মিকা। ব্যান্ডে কাজ করার আগে পর্যন্ত গানের প্রতি সেভাবে মনোনিবেশ করেননি মিকা।

তবে দাদার ব্যান্ডে যোগদানের পর থেকেই গানের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ জন্মে। গানের প্রতি ভাইয়ের আগ্রহ দেখে মিকার দাদা তাকে বলিউডের নামজাদা সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। দাদার অনুরোধে বলিউডের বহু পরিচালকই তাকে কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন বটে, তবে প্রথম প্রথম তার গান পরিচালকদের পছন্দ হচ্ছিল না। অতএব পুনরায় দাদার ব্যান্ডেই ফিরে আসতে বাধ্য হন মিকা সিং। সেখান থেকে তার নতুনভাবে সংগ্রাম শুরু হয়।

দাদার ব্যান্ডে কাজ করার পাশাপাশি তিনি নিজের একটি ব্যান্ড খুলে নেন। সেই ব্যান্ডে নিজের লেখা গান নিজেই গাইতেন তিনি। এই ব্যান্ডের দৌলতেই তিনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকেন। ১৯৯৮ সালে তার গাওয়া ‘সাওয়ান ম্যা লাগ গ্যায়ি আগ’ গানটি প্রথমবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেয়। এরপর ২০০১ সালে ‘গাব্রু’ গানের মাধ্যমেও তিনি শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ম্যানেজারের পরামর্শ মেনে অমৃক সিং নাম বদলে তিনি হয়ে ওঠেন মিকা সিং।

দু-দুটি গান পরপর হিট হয়ে যাওয়াতে বলিউড থেকেও দ্বিতীয় বার সুযোগ পেয়ে যান তিনি। ২০০৬ সালে ‘আপনা সপ্না মানি মানি’ ছবিতে একটি গান গেয়ে বলিউডে প্রথম হাতে খড়ি হয় তার। সেই গানটিও তার হিটলিস্টেই গিয়েছে। এরপর অবশ্য তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু বলিউডেই নয়, বাংলার ছেলে টলিউডের জন্যেও অনেক গান গেয়েছেন। ‘পাগলু’, ‘পাগলু টু’, ‘খোকাবাবু’, ‘রংবাজ’, ‘খোকা ৪২০’, ‘হিরোগিরি’ মতো জনপ্রিয় বাংলা ছবিতে মিকা গান গেয়েছেন।

সংগীতজগতের সুপারস্টার হওয়ার পরে একদিকে যেমন প্রভূত জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি, অপরদিকে আবার বিতর্কের সঙ্গেও বারবার জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। নিজের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রাখি সাওয়ান্তকে প্রকাশ্যে চুমু খেয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। আবার ২০১৫ সালে এক দর্শককে মঞ্চে ডেকে নিয়ে এসে থাপ্পড় মারার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে! যদিও মিকার দাবি, ওই ব্যক্তি তার পাশে থাকা এক মহিলাকে উত্যক্ত করছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, ২০১৬ সালে মিকার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন এক ফ্যাশন ডিজাইনার। ২ বছর পরে ১৭ বছরে একজন ব্রাজিলিয়ানকে উত্যক্ত করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা কান্ডের ঠিক পরে আসমুদ্রহিমাচল যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাচ্ছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের পারভেজ মুশারফের এক আত্মীয়র বাড়িতে গান গেয়ে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

এই ঘটনা তার কেরিয়ারে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অল ইন্ডিয়া সিনে ওয়ার্কারস অ্যাসোসিয়েশন তাকে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। এরপর যদিও ২০২০ সালে তিনি ২ টি গান গেয়েছিলেন। তবে সেই গান তেমনভাবে শ্রোতাদের মনে সাড়া ফেলতে পারেনি।