লঙেওয়ালা যুদ্ধের হিরো, ‘বর্ডার’-এর আসল নায়ক প্রয়াত ব্রিগেডিয়ারের সাহসিকতার কাহিনী

ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে যে কয়েকটি সিনেমা তৈরি হয়েছে ‘‌বর্ডার’ সিনেমাটি তার মধ্যে‌ অন্যতম। সিনেমায় ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ধর্মেন্দ্র পুত্র। লঙ্গেওয়ালায় অল্পসংখ্যক‌ ভারতীয় জওয়ান নিয়ে কীভাবে পাকিস্তানের সেনাকে রুখে দিয়েছিলেন চাঁদপুরী, সেটাই সিনেমার পর্দায় তুলে ধরেছিলেন সিনেমার পরিচালক। শনিবার ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন সেই কুলদীপ সিং চাঁদপুরী।

কিছু চরিত্র বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে তাদের সাহসে, তাদের পারাক্রমে। তারা যেভাবে প্রতিটি কাজ দক্ষতার সঙ্গে সামলান এবং তাদের বীরত্ব যেভাবে সম্মুখে প্রকাশিত হয় ,তাতে তার সঙ্গে যারা থাকে প্রত্যেকেই পাই লড়াই করার নতুন ইচ্ছা।আর এমনই এক বীর যোদ্ধা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরী।তার লড়াই করার ক্ষমতা খুব কম ভারতবাসী সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলেন ।কিন্তু বিখ্যাত বলিউড পরিচালক জে পি দত্তের ১৯৯৭ সালের দেশাত্মবোধক সিনেমা  “বর্ডার” এ আমরা সানি দেওয়ালের অভিনয়ের মাধ্যমে তার যে চরিত্রের স্বরূপ বাস্তবায়িত হতে দেখেছি তাতে প্রত্যেকেই তার অবদান মনে রাখবো চিরকাল।আর এই মহান ভারতীয় সেনার বীর যোদ্ধাকে আমরা আজ চিরদিনের জন্য হারালাম।

ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরী যিনি ভারত পাকিস্থানের বিরুদ্ধে বিশেষ যুদ্ধ যা “৭১’এর যুদ্ধ বা লঙেওয়ালা যুদ্ধ “নামে পরিচিত তাতে ভারতের বিজয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।এই অশেষ পরাক্রমশালী মানুষটির মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৮।সম্প্রতি তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই মারণ কর্কট রোগে ভুগছিলেন ।তিনি চিকিৎসার জন্য ভর্তি ছিলেন পাঞ্জাবের মোহালির ফর্টিস নামের বেসরকারি নার্সিংহোমে।

১৯৭১সালের ভারত পাকিস্থানের যুদ্ধের সময়  কুলদীপ সিং চাঁদপুরী ছিলেন একজন মেজর পর্যাদার ভারতীয় সেনার অফিসার।এই যুদ্ধ ভারতের পাকিস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত।

Loading...

ঠিক কী হয়েছিল সেদিন?

ডিসেম্বর ৪, ১৯৭১ সন্ধ্যাবেলায় লেফট্যেন্যান্ট ধরমবীরের কাছে খবর আসে ঘোটারু, যা লোঙ্গেওয়াল থেকে প্রায় ৪০ কিমি. দূরে, সেখান থেকে  ট্যাংক তথা বিশাল অস্ত্রবহর নিয়ে পাকিস্তান সেনা ভারতীয় ভূখন্ডে প্রবেশ করেছে ও ধীরে ধীরে জয়সলমীরের দিকে এগিয়ে আসছে।

ভারতীয় সেনা বাঙ্কার থেকে গুলির লড়াই শুরু হয়। অতর্কিত এই আক্রমণের ব্যাপারে পাক সেনারা একেবারেই তৈরী ছিল না। সারা রাত ধরে পাক ফৌজের মোকাবিলায় মাত্র দুই পুণ্যাত্মা ভারতীয় প্রাণের বিনিময়ে ১৩৫টি (সরকারী মতে) পাক-সেনার প্রাণহানি হয়। যুদ্ধশেষে পাকিস্তানের প্রায় ৩৪টি ট্যাঙ্ক ও ৫০০টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বা আটক করা হয়েছিল।

আমরণ পাকিস্তানী সেনাদের আটকে রাখার অঙ্গীকার করে, সহযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করে ও অতিরিক্ত অস্ত্রশক্তি মজুত করার আদেশ দিয়ে মেজর ভারতীয় বিমানবাহিনীর(IAF) সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় তথা বিমানবাহিনীর কাছে একটিও নাইট-ভিশন ফাইটার প্লেন না থাকায় ভারতীয় বিমানবাহিনী তৎক্ষণাৎ কিছু সাহায্য করতে সমর্থ হয়নি। ফলশ্রুতি, রিকয়েললেস গান, মর্টার, মেশিন গান ও অত্যাধুনিক সমরসজ্জায় সজ্জিত চারটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটেলিয়নে মোট ২০০০ এরও বেশী পাক সেনার মোকাবিলার জন্য মেজর কুলদীপ সিং চাঁদপুরীর কাছে পড়ে রইল কেবল ১২০ ভারতীয় জওয়ান ও সামান্য কয়েকজন রাজপুত বিএসএফ।

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে একটি HAL Krishak বিমানে স্বয়ং এয়ার কন্ট্রোলার মেজর আত্মা সিং এর নেতৃত্বে, HF-24 Marut এবং হকার হান্টার ফাইটার বাহিনী যুদ্ধের মোড় ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেন।
যুদ্ধে অসামান্য অবদান ও সাহসিকতার জন্য মেজর কুলদীপ সিং চাঁদপুরীকে মহাবীর চক্র ও আরো দশজন মহান সেনানীকে বীরচক্র পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কুলদীপ সিং চাঁদপুরী ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে একজন ব্রিগেডিয়ার রূপে অবসর গ্রহণ করেন। মৃত্যুকালে  তিনি তার স্ত্রী এবং তিন সন্তানকে রেখে গিয়েছেন।

আরও পড়ুন :  জানুন কার্গিলের অব্যক্ত ইতিহাস 

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরেন্দ্র সিং।তিনি এক টুইটার বার্তায় জানিয়েছেন “কুলদীপ সিং চাঁদপুরী একজন খুব সাহসী এবং  বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন এবং দেশ  এরকম একজন মানুষকে হারিয়ে হতদরিদ্র হল “।

সত্যিই এমন এক যোদ্ধাকে হারিয়ে দেশ এবং দেশের প্রত্যেক মানুষ মর্মাহত। আমাদের পক্ষ থেকে তার বিদেহী আত্মার প্রতি রইল বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Loading...