মোটরবাইককে অ্যামুলেন্স বানিয়ে বাঁচিয়েছেন ৪০০০ মানুষের প্রাণ, “পদ্মশ্রী”র পর বলিউডে করিমুল

অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স দূরের কথা কোনও যানই জোটেনি। শত চেষ্টা করেও মাকে বাঁচাতে পারেনি ছেলে। চোখের সামনে ছটফট করে মরে যেতে দেখেছেন নিজের মাকে। তারপরই জেদ চেপে বসেছিল, গাড়ির অভাবে হাসপাতাল পৌঁছতে না পেরে কাউকে যেন মরতে না হয়৷ অ্যাম্বুল্যান্স বা গাড়ি নেই তো কি হয়েছে? মোটর সাইকেল তো রয়েছে। রোদ–ঝড়–বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রাতবিরেতে ছুটে গেছেন। রোগীকে মোটরবাইকের পেছনে বসিয়ে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন স্থানীয় অথবা জেলা হাসপাতালে। দিন কয়েকের মধ্যে তাঁকে সুস্থ করে ফের বাড়িতেও পৌঁছে দিয়েছেন কখনও কখনও। সম্পূর্ণ বিনাপয়সায়।

এই স্বনামধন্য মানুষটির নাম করিমুল হক। জলপাইগুড়ির মালবাজার এলাকার ধোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় সুবর্ণপুর চা–বাগানের শ্রমিক। প্রায় কুড়ি বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় তিলে তিলে স্বপ্নকে সত্যি করেছেন। ৫৩ বছর মানুষটিকে সকলে একডাকে চেনে ‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’ নামে। তাঁর সেবার জন্য ভারত সরকার করিমুলকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। চোখের সামনেই বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে মরতে দেখেছেন মা জফুরান্নেসাকে। এরপরই যেভাবেই হোক অন্তত রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে উঠে পড়ে লাগলেন। প্রথম দিকে সাইকেলে করেই রোগী নিয়ে ছুটতেন। তাঁর উদ্যোগ দেখে অনেকেই রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য করিমুল হককে নিজের মোটর সাইকেল দিয়ে দিতেন ঘণ্টা কয়েকের জন্য।

ধীরে ধীরে ধারদেনা করে নিজেই একটি মোটর সাইকেল কিনে নেন তিনি। মোটর সাইকেলের সামনে লিখে দেন বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার দেওয়ার কথা। তাঁর এই অসামান্য কাজের কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে জেলার গণ্ডি ছেড়ে বাইরের জগতেও। ধলাবাড়ির আশপাশের ২০টা গ্রামের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা কারিমুলের বাইক অ্যাম্বুল্যান্স। বাইকেই মজুত অক্সিজেন, স্যালাইন, ফার্স্ট এড বক্স।

করিমুলের কথায়, ‘মা আমার অনুপ্রেরণা। তা ছাড়া আমি যে চা বাগানে কাজ করি তার মালিক সুকুমার দাস আমাকে কাজের ক্ষেত্রে অনেক ছাড় দেন। তাছাড়া পুলিশ ও প্রশাসনের সাহায্য পাই। স্কুলের দিদিমনিরাও অনেক সাহায্য করেন। প্রায় ১০ বছর ধরে এই পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

শুধু জলপাইগুড়িই নয় ডুয়ার্স–সহ গোটা উত্তরবঙ্গের মানুষ আজ গর্ববোধ করছেন করিমুল হককে নিয়ে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে কখনও হয়ত হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসেছেন তিনি, এমন সময় হয়ত ফের কোনও রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডাক পড়ল করিমুলবাবুর। খাওয়া ওভাবেই রেখে তিনি ওই রোগীকে নিয়ে ফের রওনা হয়ে যান হাসপাতালের দিকে। মা’কে হারিয়েছেন। তাই আর কাউকে হারাতে চান না করিমুল।

ছেলেও বাবাকে অনুসরণ করেছেন। তিনিও অ্যাম্বুলেন্স চালান। জনা পনেরো প্রতিবন্ধী রোগীর থাকা-খাওয়ার ব্যাবস্থা করেছেন। এখন নিজের বাড়িটাকে হাসপাতাল বানাতে চান। যেখানে ওষুধ মজুত থাকবে, থাকবেন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, রোগীর প্রয়োজনীয় সব কিছু।  এলাকায় একাধিক সমাজসেবামূলক কাজে তাঁর ডাক পড়ে। কোথাও রক্তদান শিবির হলে ডাকা হয় করিমুল হককে। আবার কোথাও বস্ত্র বিতরণ হলে ডাক পান। বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হওয়ার ফলে অ্যামুলেন্সে করে রোগী নিয়ে যেতে অসুবিধা হয়। এপ্রসঙ্গে করিমুল হক বলেন, প্রথমের দিকে অসুবিধা হত। পরে আমার দুই ছেলে হাল ধরেছে। এখন ডাক পড়লে ছেলেদের পাঠিয়ে দিই। তাছাড়া বয়স হয়েছে। এখন তো সেভাবে পারি না।একইসঙ্গে তাঁর সমাজসেবা প্রসঙ্গে করিমুল হক বলেন, “আমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যেন ফুলের মালা না দেন। সেই টাকায় পোশাক কিনে দিলে আমি খুশি হই। কারণ ওই পোশাক গরিবদের বিতরণ করা

‘অ্যাম্বুলেন্স দাদা’ করিমুল হকের জীবন এবার স্থান করে নিতে চলেছে সেলুলয়েড। করিমুল হকের জীবন নিয়ে তৈরি হবে বায়োপিক। ইতিমধ্যেই মুম্বই থেকে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন পরিচালক। চুক্তি পর্ব সেরেছেন তাঁরা। এবার গবেষণার পর কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষা। জীবনীনির্ভর ছায়াছবিটি পরিচালনা করবেন বিনয় মুদগলে। করিমুল হকের চরিত্রে কে অভিনয় করবেন? খুব সম্ভবত ফারহান আখতার অথবা আমির খান। আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে বায়োপিকটির জন্য। নাম এখনও ঠিক না হলেও, প্রাথমিকভাবে শোনা যাচ্ছে সিনেমাটির নাম হতে পারে ‘দেবদূত অ্যাম্বুল্যান্সম্যান’।