রাস্তা থেকে উঠে রেস্টুরেন্টের মালিক, ভাগ্যের ফেরে আবারও রাস্তায় ‘বাবা কা ধাবা’

Baba Ka Dhaba

গতবছর যখন করোনা প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষে আক্রমণ চালায় তখন কেন্দ্রীয় সরকার নিতান্ত বাধ্য হয়েই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়। লকডাউনের প্রভাবে করোনার আক্রমণের হাত থেকে ভারতবাসীকে বাঁচানো সম্ভব হলেও বহু মানুষ রাতারাতিই বেরোজগার হয়ে পড়েছিলেন। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছিল যে, মহামারীর দরুন নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ কার্যত ক্ষুধার জ্বালাতেই দুঃসহ জীবন যাপন করতে শুরু করেন!

লকডাউনের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল দিল্লির কান্ত প্রসাদের পরিবারের উপর। দিল্লির বুকে স্ত্রীর সহযোগিতায় “বাবা কা ধাবা” (Baba Ka Dhaba) চালাতেন ৮০ বছরের এই বৃদ্ধ। প্রতিদিন খাবার বিক্রি করে যা উপার্জন হতো, ৮ জনের সংসার তাতে কোনও রকমে চলতো। কিন্তু করোনা এই বৃদ্ধ দম্পতির শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয়। লকডাউনের প্রভাবে বন্ধ হয়ে যায় “বাবা কা ধাবা”। তবে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে মনে হয় খুব বেশি সময় লাগে না।

কান্ত প্রসাদের জীবনে সেই সময় দেবদূত হয়ে এসেছিলেন দিল্লির ইউটিউবার গৌরব ওয়াসান। “বাবা কা ধাবা”য় খেতে এসে তিনি ওই বৃদ্ধ দম্পতির একটি ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেন। যেখানে দেখা যায় গ্রাহকের অভাবে ধাবার করুন পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেছেন ওই বৃদ্ধ দম্পতি! এই ভিডিওটি সোশ্যাল সাইটে আপলোড করে দেন ওই ইউটিউবার। নেটিজেনদের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল এই ভিডিও। যে কারণে রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছিল তার।

baba-da-dhaba

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের দৌলতে “বাবা কা ধাবা”র খ্যাতি সেই সময় কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরদিন থেকেই তার দোকানে গ্রাহকের ভিড় উপচে পড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ইউটিউবার গৌরবের মারফত “বাবা”কে সাহায্য করার জন্য টাকা পাঠাতে থাকেন। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক লক্ষ টাকা অনুদান পেয়ে গিয়েছিলেন কান্ত প্রসাদ। এরপর বিশিষ্ট সমাজকর্মী তুষান্ত অদলখার পরামর্শ ও সহযোগিতায় কান্ত প্রসাদ গতবছর ডিসেম্বর মাসে ধাবা ছেড়ে নিজের নামে একটি রেস্তোরাঁ খুলে ফেলেন।

সেই রেস্তোরাঁতে আগেকার মতো ডাল-ভাত, রুটি-সবজির মেনু বাদ দিয়ে ইন্ডিয়ান এবং চাইনিজ খাবার রাখতে শুরু করেন কান্ত প্রসাদ। তিনি নিজে আর রান্না করতেন না। তিনজন রাঁধুনি রেখেছিলেন রেস্তোরাঁতে। তার দুই ছেলে ক্যাশ কাউন্টার সামলাতেন। সবকিছু বেশ ভালোই এগোচ্ছিল। তবে তাল কাটলো কিছুদিনের মধ্যেই। আসলে রেস্তোরাঁ চালানোর মতো দক্ষতা ছিল না ধাবার মালিক কান্ত প্রসাদের।

Baba Ka Dhaba

এখন তিনি নিজের রেস্তোরাঁ খোলার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন সমাজকর্মী তুষান্তের পরামর্শ মেনে তার ক্ষতি বৈ লাভ হয়নি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা খরচ করে তিনি রেস্তোরাঁটি বানিয়েছিলেন। দোকানভাড়া বাবদ প্রতিমাসে ৩৫ হাজার টাকা, কর্মচারীদের বেতন ৩৬ হাজার টাকা, ইলেকট্রিক-জলের বিল বাবদ ১৫ হাজার টাকা, তার উপর রান্নার জিনিসের খরচ তো আছেই। প্রতিমাসে ১ লক্ষ টাকার ধাক্কা! এদিকে মাসে খাবার বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকাও উঠতো না।

কান্ত প্রসারের দাবি, “তুষান্ত আমাদের ভুল পরামর্শ দিয়েছিলেন। রেস্তোরাঁ খোলাই কাল হল”! এ প্রসঙ্গে তুষান্তের পাল্টা দাবি, “আমি ও আমার টিম সবরকম সাহায্য করেছি ওঁদের দোকানটা খুলতে। এদিকে ওঁর দুই ছেলে দোকানে আসতই না। লকডাউন তো কী হয়েছে? অনেক হোম ডেলিভারির অর্ডার আসত, ওঁরা তো গা-ই করতেন না। এভাবে দোকান চলে নাকি! আমরা কী করব?” পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করেও তো কোনও লাভ নেই। কান্ত প্রসাদ তাই এখন রেস্তোরাঁ ছেড়ে আবার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছেন! গতবারের মতো তাকে সাহায্য করার মতো গৌরব ওয়াসান এখন আর তার পাশে নেই।

Baba Ka Dhaba

কেন নেই? কারণ যে গৌরব তাকে সাহায্য করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের মামলা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন কান্ত প্রসাদ! তাই তিনিও বাবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। গৌরবের কথা অনুযায়ী, “এক পয়সাও নিইনি আমি। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে এত করেও এসব শুনতে হচ্ছে। এখন তো আবার ফোন করছে। আমি আর ধরিনি। আমার আর কিছু যায় আসে না”। ভাগ্যের ফেরে আবার স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় স্টলে দাঁড়িয়ে ডাল, রুটি, ভাত, সবজি বিক্রি করছেন কান্ত প্রসাদ। তার বেকার দুই ছেলের পরিবারের দায়িত্বও যে তার কাঁধেই!