৩০০০ বছর ধরে মহাভারতের এই যোদ্ধা এখনো জীবিত, জানুন তার পরিচয়

ভারতীয় পরম্পরায় বেশ কিছু পৌরাণিক চরিত্রকে অমর বলে মনে করা হয়। তাঁরা হলেন – হনুমান, বলীরাজ, ব্যাসদেব, বিভীষণ, কৃপাচার্য, পরশুরাম, মার্কণ্ডেয় এবং অশ্বত্থামা। এই অমরবৃন্দ সম্পর্কে বহু কাহিনিই প্রচলিত রয়েছে। এঁদের মধ্যে শ্রীহনুমান এবং অশ্বত্থামাকে নিয়েই প্রলিত রয়েছে সব থেকে বেশি কাহিনি।

সারা দেশেই হনুমান পূজিত। কিন্তু অশ্বত্থামা? তাঁর সম্পর্কে কিংবদন্তি ঠিক কী কারণে আজও বহমান, তা বোঝা দুরূহ। তবে এ দেশের একটা বিরাট অংশের মানুষের বিশ্বাস, অশ্বত্থামা আজও জীবিত। এবং তাঁকে দেখাও যায়।

মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সাতপুরা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আসিরগড় ফোর্ট। এই কেল্লাতেই নাকি আজও বাস করেন অশ্বথামা। এই কেল্লার শিবমন্দিরে প্রতিদিন নাকি পুজো করেন অশ্বথামা। রোজ সকালে এই মন্দিরে দেখা যায় টাটকা ফুল আর আবির শিবলঙ্গের কাছ রাখা। কে সবার আগে রোজ এখানে পুজো করে যান, তা কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। হাজার হাজার বছর ধরে শিবপুজো করে অশ্বথামা তাঁর পাপস্খালনের চেষ্টা করছেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস।

শিবের তপস্যা করে তাঁর বরদানে মহা-শক্তিশালী পুত্রলাভ করেছিলেন দ্রোণাচার্য। দেবাদিদেবের বরে অশ্বত্থামার কিছু অনন্য শক্তি ছিল। অন্যদের তুলনায় বেশি ক্ষমতাশালী হওয়ার পাশাপাশি, অশ্বত্থামার কপালে একটি রত্ন ছিল। যে কারণে, তাঁর মধ্যে দৈবিক শক্তি ছিল। অশ্বত্থামা ছিলেন অজেয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ব্যথা ও শ্রান্তি তাঁকে ছুঁতে পারত না। মহাদেবের বরে তিনি অমরত্বলাভ করেছিলেন।

অস্ত্র ব্যবহারের কলা ও রণকৌশল শেখার জন্য ছোট বয়সেই বাবা দ্রোণাচার্যের গুরুকূলে যোগ দিয়েছিলেন অশ্বত্থামা। সেই সময় কৌরব ও পাণ্ডব– উভয় পক্ষই দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিত। তবে, পাণ্ডবদের তুলনায় কৌরব, বিশেষ করে দুর্যোধনের বেশি কাছে ছিলেন অশ্বত্থামা।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ দিকে কৌরবপক্ষের সেনাপতি হন অশ্বত্থামা। দুর্যোধনকে গুরুতর জখম অবস্থায় দেখে, অশ্বত্থামা পণ করেছিলেন, পাণ্ডবদের থেকে তিনি এর প্রতিশোধ তুলবেন। একইসঙ্গে বাবাকে ছলের মাধ্যমে হত্যা করার বদলাও নেবেন। সেই মোতাবেক, অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের শিবিরে যান পাঁচ ভাইকে হত্যা করে দুর্যোধনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে। অশ্বত্থামা এক রাতে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে পঞ্চপাণ্ডব ভেবে ভুল করে পাঁচ পাণ্ডব-সন্তানকে হত্যা করেন।

নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে মহর্ষি বেদব্যাসের সঙ্গে দেখা করেন অশ্বত্থামা। ঠিক ওই সময়ে দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানের হত্যার জন্য অশ্বত্থামার থেকে বদলা নিতে পাণ্ডবরাও ব্যাস ঋষির আশ্রমে পৌঁছন। পঞ্চ পাণ্ডবকে একসঙ্গে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন অশ্বত্থামা। পাঁচ ভাইকে একসঙ্গে মারতে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করেন তিনি। পাল্টা শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করতে।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংসের কথা ভেবে, ব্যাস ঋষি নিজের দৈবিক শক্তি ব্যবহার করে দুটি ব্রহ্মাস্ত্রের সংঘর্ষ রুখে দেন। অর্জুন ও অশ্বত্থামাকে নিজ নিজ অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে বলেন মহর্ষি। কিন্তু অশ্বত্থামা বলেন, তিনি ওই অস্ত্র ফেরানোর কৌশল জানেন না। ব্যাসঋষি তখন অশ্বত্থামাকে বলেন, অস্ত্রের দিশা পাল্টে দিতে। অশ্বত্থামা ইচ্ছাকৃতভাবে অভিমন্যূর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী উত্তরার দিকে তাক করেন।

গর্ভস্থ শিশুর হত্যা করায় অশ্বত্থামাকে অভিশাপ দেন শ্রীকৃষ্ণ। সেই অভিশাপের মর্মার্থ ছিল – অশ্বত্থামা কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত হবেন এবং সেই রোগ তাঁকে ৩০০০ বছর ধরে তাড়া করে বেড়াবে। কেউ তাঁকে আশ্রয় দেবে না। নিরন্তর ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় তাঁকে কালনিরবধি থেকে যেতে হবে। অশ্বত্থামা তাঁর সবথেকে বড় সম্পদ, তাঁর শিরোমণি পরিত্যাগ করে এই অভিশাপকে বরণ করে নেন।

তার পরে যুগের পরে যুগ অতিবাহিত হয়েছে। পল্লবিত হয়েছে অশ্বত্থামার কাহিনী। কখনও শোনা যেতে থাকে, অশ্বত্থামাকে দেশেই দেখা গিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও বেশ কিছু মানুষ দাবি করেছেন যে, তাঁরা অশ্বত্থামার সাক্ষাৎ পেয়েছেন। শোনা যাক সেই দাবির কয়েকটি।

মধ্যপ্রদেশের এক চিকিৎসক একবার জানান, এক অসুস্থ ব্যক্তি কপালের ঠিক মাঝখানে এক গভীর ক্ষত নিয়ে তাঁর কাছে আসেন। অব্যর্থ সব ওষুধেও সেই ক্ষত সারেনি। চিকিৎসকের মনে হয়, এই ক্ষত বহু যুগের পুরনো। একে সারানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন – ‘আপনি কি অশ্বত্থামা?’ তার পরে তিনি কিছু একটা নিতে পিছন ফেরেন। মুহূর্তকাল পরে যখন সামনে তাকিয়েছেন, ঘরে আর কেউ নেই।

ভারতের বেশ কিছু যোগী দাবি করেন, তাঁরা হিমালয়ের গহীন অঞ্চলে অশ্বত্থামাকে দেখেছেন। কোনও এক মন্দিরে প্রত্যূষে অশ্বত্থামা শিবলিঙ্গে পুষ্প নিবেদন করতে আসেন। হিমালয়-পাদদেশে এক দীর্ঘকায় ব্যক্তির কথা প্রায়শই শোনা যায়, যাঁর কপালের মাঝখানে ক্ষত। তিনি নাকি এক ধাবা-মালিকের সঙ্গে বছরে একবার সাক্ষাৎ করতে আসেন।

তিনি নাকি বিপুল পরিমাণে আহার করেন এবং প্রায় ১০০ লিটার জল পান করেন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, তিনি বছরে একবারই আহার করেন। আবার অনেকের মতে, তাঁকে সবাই দেখতে পাবেন না। কারণ, কাকে তিনি দেখা দেবেন আর কাকে দেবেন না, সেটা তাঁর নিজের বিচারের উপরেই নির্ভর করছে।

কৃষ্ণের অভিশাপে কুষ্ঠ রোগে বিধ্বস্ত, সহায়হীন, সম্বলহীন, অস্ত্রের গৌরবহীন একা বীর পরিভ্রমণ করে চলেছেন পথের পরে পথ, তাঁর ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই, নিদ্রা নেই – এই কল্পনা কোথাও এক মহারহস্যকে নির্মাণ করে। আর সেখানেই বোধ হয় অশ্বত্থামা অমর।