ভোটের কালি লাগলে ছাড়ে না কেন, ভোটের কালি কীভাবে তৈরী হয়

488

বাউল গেয়েছেন, “পিরিতি কাঁঠালের আঠা, লাগলে পরে ছাড়ে না”। তবে কাঁঠালের আঠা অবশ্য বিভিন্ন উপায়েই ছাড়ানো যাবে। কিন্তু ভোটের কাজে ব্যবহৃত “ইনডেলিবল ইনক” কোনওভাবেই হাত থেকে মোছা যাবে না। আমাদের মধ্যে যাদের একবার হলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়েছে, ভোট দেওয়ার আগে তাদের প্রত্যেকেরই বাঁ হাতের তর্জনীতে ভোটের কালি লেগেছিল।

এই কালি সাবান দিয়ে ঘষলেও ওঠে না, রিমুভার দিয়ে মুছলেও মোছা যায় না। কোনো এক অজ্ঞাত ফর্মুলায় বানানো হয়েছে ভোটের জন্য ব্যবহৃত এই বিশেষ কালি। এই কালি আবার খোলা বাজারে পাওয়াও যায় না। ভারতের বিশেষ একটি সংস্থা ছাড়া এই ইনডেলিবল কালি তৈরির অধিকারও নেই অন্য কোনও সংস্থার।

নির্বাচন কমিশন, ভারতীয় আইন মন্ত্রক, ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি অফ ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল রিসার্চ ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশনের চুক্তি অনুযায়ী “মাইসোর পেইন্টস অ্যান্ড বার্নিশ লিমিটেড’ সংস্থা ১৯৬২ সালে ভোটের জন্য ব্যবহৃত এই বিশেষ কালি তৈরির বরাত পায়। ভারত ছাড়াও নেপাল, আমেরিকা, পাকিস্তান, ডেনমার্ক, তুরস্কের মতো ২৫টি দেশের জন্য ভোটের কালি বানায় এই সংস্থাটি।

West Bengal Assembly Election 2021 Vote

ভোটের কালিতে কি থাকে?

এই কালি তৈরির অতি গোপন ফর্মুলাটি সাধারণের নাগালের বাইরে। তবে কালি তৈরির মূল উপাদান হলো সিলভার নাইট্রেট এবং ডিসটিল ওয়াটার। এই কালির দ্রবণে সিলভার নাইট্রেট থাকার কারণে তা যখনই ত্বকের সংস্পর্শে আসে তখন ত্বকে উপস্থিত প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাছোড়বান্দা দাগ ফেলে দেয় ত্বকের উপর। এরপর ভোটার যখন ভোট কেন্দ্র থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন তখন সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এসে দাগ আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ে।

ভোটের কালি আসলে সিলভার নাইট্রেট বা AgNO3 আর পাতিত জলের মিক্সচার। সঙ্গে কিছুটা অ্যালকোহল। তাই চট করে শুকিয়ে যায় কালিটি। আর থাকে বিশেষ কিছু রং। এখন, এই সিলভার নাইট্রেট চামড়ার প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সে ফেলে বিশেষ এক প্রকার অধঃক্ষেপ, যা এক্কেবারে সেঁটে যায় চামড়ার সঙ্গে। সিলভার নাইট্রেটের আধিক্য যত বেশি থাকবে, তত টেকসই হবে কালি।

আমাদের দেশে সচরাচর ১৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকে সিলভার নাইট্রেটের ঘনত্ব, তাতে হপ্তা তিনেকের জন্য নিশ্চিন্তি! আর, কালি লাগানোর পর এক ছটাক অতিবেগুনি রশ্মি যদি তার উপর পড়ে, তবে তো রুপোয় সোহাগা! বেগুনি কালি রং বদলে কালচে-বাদামি হয়ে আরও চিপকে বসে আঙুলে।

ভোটের কালি কিভাবে তোলা যায়?

টুথপেস্ট লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ব্রাশ দিয়ে আলতো ঘষলেই এই কালি উঠে যায়। অথবা দুর্বা ঘাস তুলে তার রস লাগালেও ভোটের কালি উঠে যায়। শোনা যায় দেশলাই কাঠি জলে ভিজিয়ে তার বারুদটুকু কালির ওপর 108 বার ঘষলে ভোটের কালি উঠে যায়।  ভোট দিতে যাওয়ার আগে হাতে স্বচ্ছ নেলপালিশ বা গঁদের আঠা লাগালে পরে ভোট দিয়ে বেরিয়ে নেলপালিশ রিমুভার দিয়ে ঘষলেই এই কালি উঠে যায়।

ভোটের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে ভারতের তৃতীয় নির্বাচনের সময় প্রথম এই ইনডেলিবল ইনক ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই সময় তর্জনীর নখ এবং ত্বকে আড়াআড়িভাবে ভোটের কালি লাগানো হতো। এরপর ২০০৬ সালে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে আরোপিত নিয়ম অনুযায়ী, ভোটারের বাম হাতের তর্জনীর মাঝখান থেকে আঙ্গুলের প্রথম গাঁট পর্যন্ত ভোটের কালি লাগানো হয়।