ক্লাস ৫ ফেল, ১৫০০ টাকায় শুরু করে আজ ২০০০ কোটি টাকার মালিক!

109

আকর্ষণীয় চেহারার মডেল ছাড়াই ভারতের প্রতিটি রান্নাঘরে সমাদৃত তার মশলার ব্র্যান্ড এমডিএইচ (MDH)। আর এই ব্র্যান্ডের পেছনের মানুষটি হলেন ভারতের সর্বাধিক বেতনভুক্ত কনজুমার প্রডাক্ট সিইও, ৯৪ বছর বয়সী ধরমপাল গুলাটি, যার বিগত অর্থ বছরের বেতন ছিল ২১ কোটি রুপী! হ্যাঁ, মাত্র ১৫০০ টাকা অবলম্বন করে জীবন শুরু করা এই মানুষটির এমডিএইচ (MDH)-এর সাবেক অর্থ বছরে স্যালারি হয়েছে ২১ কোটি। এই অসাধারণ মানুষটির সাফল্যের পেছনে আছে অনুপ্রেরণার এক অসাধারণ গল্প।

বার্ধক্য থাবা বসাতে পারেনি ব্যস্ত জীবনে। দেশের অন্যতম অগ্রণী খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থার সিইও ধরমপাল গুলাটিকে চেন।
জনপ্রিয় মশলার ব্র্যান্ড এমডিএইচ-এর যে কোনও প্যাকেটের উপর রমপালের ছবি শোভা পায়। তাঁকে দেখা যায় সংস্থার টিভি বিজ্ঞাপনেও। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পরে লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে দেন ধরমপাল। গত অর্থনৈতিক বছরের হিসেব অনুযায়ী, তাঁর বেতন বছরে ২১ কোটি টাকারও বেশি।

হিসাব দেখিয়ে দিচ্ছে এমডিএইচ কর্তার আয় গোদরেজ গ্রুপের আদি গোদরেজ, গোদরেজ কনজিউমার সংস্থার বিবেক গম্ভীর, হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের সঞ্জীব মেহতা বা আইটিসির ওয়াই সি দেবেশ্বরের চেয়েও বেশি। শতবর্ষ ছুঁতে চলা ধরমপালকে সকলে দাদাজি অথবা মহাশয়জি নামেই সম্বোধন করে থাকেন। এই বয়সেও নিয়মিত কারখানা, বাজার ও ডিলারদের ঘাঁটিতে তিনি নিয়মিত ঢুঁ মারেন। সংস্থায় তাঁর মালিকানা বর্তমানে ৮০%।

আজ থেকে ছয় দশক আগে কথা। পাকিস্তানের শিয়ালকোটে ১৯২৩ সালে জন্ম নেওয়া ধরমপাল ১০ বছর বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন অর্থাভাবে। এরপর তিনি যোগ দেন পৈতৃক মশলার ব্যবসায়। অন্যান্য ব্যবসাতেও নিজের ভাগ্য যাচাই করে দেখতে চান তিনি, সাবানের ব্যবসা, কাপড়ের ব্যবসা এমনকি চালের ব্যবসাও করেছেন এক সময়ে। কিন্তু খুব বেশি সময় ধরে কোনো ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। একটা সময়ে বাবা চুনি লালের ব্যবসার হাল ধরেন আবার। যখনই একটু থিতু হতে শুরু করলেন, তখনই দেখা যায় বিপর্যয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ হবার পর তিনি জানতে পারেন শিয়ালকোট হবে পাকিস্তানের অংশ, তখন তিনি পাকিস্তান ছেড়ে ইন্ডিয়া চলে আসেন। অমৃতসর রিফিউজি ক্যাম্পে কিছুদিন থেকে এসে পড়েন দিল্লী। বাবার কাছে থেকে পাওয়া ১,৫০০ টাকা ছিল তার সম্বল। এর কিছুটা খরচ করে একটা টাঙ্গা (ঘোড়ায় টানা গাড়ি) কেনেন এবং তা চালিয়ে কিছু উপার্জন শুরু করেন।

ধরমপালের বাবা চুনিলাল গুলাটির হাতে মশলার ব্যবসার সূচনা হয়। ১৯১৯ সালে শিয়ালকোটের এক ছোট্ট দোকান থেকে শুরু করে এমডিএইচের এখন ১৫০০ কোটির টাকার বিশাল সাম্রাজ্য। দেশ ভাগ হওয়ার পরে পাকিস্তান ছেড়ে দিল্লির কারোলবাগে দোকান খোলেন ধরমপাল। ক্রমে দেশজুড়ে গড়ে ওঠে তাঁর ১৫টি কারখানা এবং ১০০০ ডিলার। শুধু তাই নয়, দুবাই ও লন্ডনেও অফিস খুলেছে এমডিএইচ। বর্তমানে প্রায় ১০০টি দেশে পণ্য রপ্তানি করা হয়। সংস্থার হাল আপাতত ধরেছেন ধরমপালের ছেলে। তাঁর ৬ মেয়ে রয়েছেন এলাকা ভিত্তিক পণ্য সরবরাহের দায়িত্বে।

৯৫ বছর বয়সেও ২০০০ কোটি টাকার ব্যবসা সামলে চলেছেন ধর্মপাল। পদ্মভূষণে সম্মানিত এই ব্যক্তিত্ব ‘মহাশয়া দি হাট্টি’ বা এম ডিএইচ গ্রুপের মালিক। দেশে খাদ্যদ্রব্য বিষয়ক বাণিজ্যমহলে তাঁর আয় সবচেয়ে বেশি।

অনেকেই বলে থাকেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ফেল করেন গুলাটি। পড়াশুনো তাঁকে ছেড়ে গেলও, উত্থানের অঙ্ক ধর্মপাল জানতেন! পাকিস্তানের জন্মগ্রহণকারী ধর্মপাল, দেশভাগের সময় এদেশে আসেন পরিবারের সঙ্গে। শিয়ালকোটের এই পরিবার শুরু করে মশলার ব্যবসা।

আরও পড়ুন ঃ  SIM বিক্রেতা থেকে কোটিপতি হওয়ার গল্প

করোল বাগে মশলার ব্যবসা শুরু হয় গুলাটি পরিবারের। তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন ধর্মপাল। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। শুরু হয় এমডি এইচ গ্রুপের নামে ব্যবসার পথ চলা। ২০১৮ সালে তাঁর রোজগার ছিল ২৫ কোটি টাকা।
কোম্পানির সাফল্যের মুলে রয়েছে তাদের সাপ্লাই চেইন। কৃষকদের সাথে চুক্তি করে তো তারা মশলার উপাদান উত্পাাদন করান, এর পাশাপাশি কর্নাটক, রাজস্থা, আফগানিস্থান এবং ইরান থেকেও তাদের মশলা আসে। ইদানিং এই লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্রে MDH এর কিছু প্রতিপক্ষ দেখা যাচ্ছে। এভারেস্ট ব্র্যান্ডের এস নরেন্দ্রকুমার, হলো বর্তমানের মার্কেট লিডার, তার শেয়ার ১৩ শতাংশ এবং MDH এর ১২ শতাংশ।

আরও পড়ুন ঃ পকোড়া বিক্রি করে কোটিপতি! আয়কর দিলেন ৬০ লক্ষ টাকা

তার এই সাফল্যের মূলমন্ত্র কী? তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের সেরা কাজটি করলে ফলাফল হিসেবেও আপনি সেরাটাই পাবেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করে গেছেন সাশ্রয়ী মূল্যে। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া সত্ত্বেও তাই তিনি এখন একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
ভারতে ও দুবাইতে মোট ১৮ টি কারখানা রয়েছে এমডিএইচ গ্রুপের। ৬২ রকমের পণ্য বিক্রি করে এমডিএইচ গ্রুপ। তবে ৯৫ বছর বয়স পেরিয়ে গেলেও, ধর্মপাল গুলাটি এখনও নিজের সমস্ত ক’টি কারখানা ও দফতরে নজরদারি চালান। প্রতিদিন দিল্লি থেকে গুরগাঁও, ফরিদাবেদের দফতর দেখতে বের হন তিনি। পাশাপাশি হোয়াটস্যাপেও সমান সাবলীল এই কর্ণধার।

Loading...