অষ্টমীর দিন কুমারী পুজো কেন হয়? কুমারী পুজো করে কী লাভ হয়?

309

বলা হয় যে দেবী দুর্গা  কুমারী রূপ ধারণ করেই কোলাসুরকে বধ করেছিলেন। এছাড়া রামচন্দ্রের অকাল বোধন এর সময় দেবী জাগ্রত হয়ে বিল্ব বৃক্ষের একটি বিল্ব পত্রে কুমারী রূপেই আবির্ভূতা হন। এছাড়া শাস্ত্রে বলেছে যে  মানুষের মধ্যেই রয়েছেন ঈশ্বর। মানুষের পুজো করলেই ঈশ্বরের পুজো হয়।

অন্যদিকে প্রত্যেক নারীর মধ্যে রয়েছে শক্তিরূপিণী দুর্গা। অপরদিকে প্রকৃতিকে নারীর  অপর রূপ বলে ধরা হয়। এই সকল কারণেই প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা কুমারী পুজোর মধ্য দিয়ে প্রকৃতির আরাধনা করতেন। আর এই কারনেই কুমারী পুজোর সূচনা।

কুমারী পূজা কেন করা হয়

সেকালে মুনিঋষিরা কুমারীপুজোর মাধ্যমে প্রকৃতিকে পুজো করতেন। প্রকৃতি মানে নারী। সেই প্রকৃতিরই আর এক রূপ কুমারীদের মধ্যে দেখতে পেতেন তাঁরা। তাঁরা বিশ্বাস করতেন মানুষের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের অযুত প্রভাব। কারণ মানুষ চৈতন্যযুক্ত। আর যাঁদের সৎ মন কলুষতামুক্ত, তাঁদের মধ্যে আবার ঈশ্বরের প্রকাশ বেশি। কুমারীদের মধ্যে এই গুণগুলি থাকে মনে করেই তাদের বেছে নেওয়া হয় এই পুজোর দেবী হিসেবে।

কুমারী পূজা কিভাবে করা হয়

পরিণত বয়সের নারীর চাইতে একজন কুমারী নারীর হৃদয় হয় অধিক সরল কারণ সে সংসারের যাবতীয় চাপ থেকে মুক্ত হ‌য়। এই কারণে তার মনের মধ্যে কোনও রকম জটিলতা ও থাকে না, তাই তাকে ঈশ্বরেরই প্রতীকরূপে অষ্টমী তিথিতে পুজো করা হয়।

এই কুমারী পুজোর ক্ষেত্রে ১ বছর থেকে ১৬ বছর বয়সের অজাতপুষ্প সু লক্ষণ যুক্তা কুমারী কে এই পুজোর জন্য বেছে নেওয়া হয়। ব্রাহ্মণ ও  অন্যান্য যে কোনো গোত্রের অবিবাহিত কন্যাকেই কুমারী পুজোর জন্য পুজোতে বেছে নেওয়া যেতে পারে।

বিভিন্ন বয়সের কুমারীদের বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। ১ বছরের মেয়েদের বলা হয় ‘সন্ধ্যা’। ৭ বছরের মেয়েদের বলা হয় ‘মালিনী’।১২ বছরের মেয়েদের ‘ভৈরবী’। ১৬ বছরের মেয়েদের বলা হয় ‘অম্বিকা’।

কুমারী পূজার ইতিহাস

কুমারী পূজার সূচনা হয়েছিল আনুমানিক ৪ হাজার ৫০০ বছর আগে মহাভারতের সময়ে‌। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে দুর্যোধনের সৈন্য যুদ্ধের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছে দেখে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ভদ্রকালীর বন্দনা করতে বলেন।

এই সময় শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে অর্জুন যুদ্ধের রথ থেকে নেমে করজোড়ে ভদ্রকালীর বন্দনা করতে শুরু করেন। মহাভারতে ভদ্রকালীর বন্দনার সাথে সাথে অর্জুন কুমারী পুজোও করে ছিলেন। আর তারপর এত সময় ধরে এখনো কুমারী পুজোর ধারা বহমান। ভারতের নানা মন্দিরে এছাড়া কামাখ্যা ও নেপালেও এই পুজো হয়। এই কুমারী পুজোর শুরু সর্বপ্রথম হয় দক্ষিণ ভারতের কন্যাকুমারীতে।

পুরাণ মতে কুমারী পুজোর ইতিহাস

পুরাণে বলা হয় বার্নাসুরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেই কন্যাকুমারীর সাগর জলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেখানে কুমারী মূর্তিতে স্বয়ং পার্বতীর আবির্ভাব হয়েছিল। বার্ণাসুর কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার থেকে বর লাভ করেন। এরপর ব্রহ্মার থেকে বর পেয়ে তিনি ত্রিলোক জয় করেন। অসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেব কুল তখন ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু তখন দেবরাজ ইন্দ্র কে যজ্ঞ করার পরামর্শ দেন। দেবরাজ ইন্দ্রের সেই যজ্ঞে বার্ণাসুর কে বধ  করবার জন্য কুমারী কন্যার আবির্ভাব হয়।

এই কুমারী কন্যা জন্মের পর দক্ষিণের সাগরতীরে চলে যান তপস্যা করবার জন্য। তিনি তপস্যা করতে চেয়ে ছিলেন মহাদেবকে স্বামী রূপে পাওয়ার আশায়। তার কঠোর তপস্যায় সাড়া দিয়েছিলেন মহাদেবও। কিন্তু বিবাহ হয়ে গেলে তিনি যদি আর কুমারী না থাকেন তাহলে বার্নাসুর নিধন হবে না। এই কারণে দেবর্ষি নারদ বুদ্ধি বার করলেন। তিনি কুমারীকে মন্ত্রণা দিলেন‌।নারদ এর মন্ত্রণায় কুমারীকন্যা মহাদেবের কাছ থেকে চাইলেন তিনটি দুর্লভ বস্তু। চক্ষুহীন নারকেল,শিরাহীন  তাম্বূল আর গ্রন্থিহীন ইক্ষু।একই সাথে তিনি দেবাদিদেব কে শর্ত দিলেন যে রাত্রিকাল এর মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে সূর্যোদয় হয়ে গেলে তিনি অরক্ষণীয়া হয়ে থাকবেন।

মহাদেব কন্যার চাওয়া সেই সকল বস্তু সংগ্রহ করে বিবাহের জন্য রওনা দিলেন। কন্যাকুমারী থেকে অল্প দূরত্বে  শুচিন্দ্রমে  তিনি তখন এসে পৌঁছেছেন দেবর্ষি নারদ মহাদেব কে বিভ্রান্ত করতে মোরগের ডাক সৃষ্টি করলেন। মহাদেব শুচিন্দ্রমে দাঁড়িয়ে ভাবলেন ভোর হয়ে গেছে। তাই তিনি আর এগোলেন না। অপরদিকে দেবী কুমারী ও অরক্ষণীয়া হয়ে রইলেন। বিবাহের সমস্ত জিনিস সাগরের ঢেউয়ে ভেসে গেল। যথাসময়ে নারদের ইচ্ছাও পূর্ণ হল বার্ণাসুরকে বধ করলেন দেবী কুমারী।

বার্নাসুর এর অন্তিম প্রার্থনা মেনে তার দেহত্যাগের স্থান  বাণতীর্থ নামে প্রচার করা হলো। ১৯০১  এক সালের ১৮ অক্টোবর প্রথম দুর্গাপুজোর অষ্টমী তিথিতে বেলুড়মঠে স্বামী বিবেকানন্দ কুমারী পুজোর প্রবর্তন করেন।নানান উপকরণ দিয়ে কুমারী কন্যাকে পুজোর পর ভজন করাতে হয়। এরপর তাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে দক্ষিণা দিতে হয়। আর নিবেদিত উপকরণ সকল মানুষের মধ্যে প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করতে হয়।

কুমারী পুজো হলো সাত্ত্বিক পুজোর অঙ্গ। ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কন্যা ও ঋতুমতী না হওয়া কুমারী কন্যাকেই  এই পুজোর জন্য বেছে নেওয়া হয়।একটি কুমারী কন্যাকে খাওয়ালে সারাবিশ্ব ভূবনকে খাওয়ানো হয়। শক্তিপীঠ গুলোতে কুমারী পুজো করলে অশেষ ফল লাভ হয়। এছাড়া

কুমারী পুজো করে কী লাভ হয়?

১।কুমারী পুজো করলে বিঘ্ন ,ভয় দূরে চলে যায়।

২।এই পুজোর অনুষ্ঠানকারীর ক্ষতি শত্রুতে করতে পারেনা। অর্থাৎ শত্রু ভয় কেটে যায়।

৩।কঠিন রোগ থেকে  মুক্তি লাভ হয়।

৪।এই পুজো করলে গ্রহের অশুভ প্রভাব কেটে যায়।

৫।এই পুজো করলে সকল দুঃখ নাশ হয়।

৬।এই পুজো করলে বিদ্যালাভ ও ধনপ্রাপ্তি হয়।

৭।এই পুজো করলে সৌভাগ্য লাভ হয় ও যশ ভাগ্য ফেরে।

৮।এই পুজো করলে দারিদ্র নাশ হয়।