একরাশ ক্ষোভ আর ভালবাসা খামে মুড়ে ছেলেকে খোলা চিঠি লিখলেন ‘দেশের মাটি’র রাজা

গতকাল অর্থাৎ ২০শে জুন, দেশজুড়ে ফাদার্স ডে (Father’s day) বা পিতৃ দিবস পালন করা হয়েছে। প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবারের দিনটি বাবাদের জন্যই তোলা থাকে। সন্তানরা এদিন সকাল থেকেই তাদের জীবনের সুপার হিরোকে জানিয়ে ফেলছেন তাদের মনের কথা, বাবার প্রতি ভালোবাসার কথা, শ্রদ্ধা-সম্মান জানানোর কথা, যে কথা হয়তো কখনও বলে ওঠা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বাবাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সন্তানের হৃদয়ের সেই অব্যক্ত বার্তা।

এই দিনটি যতখানি সন্তানদের, ঠিক ততখানিই বাবাদেরও বটে। তাই এই বিশেষ দিনটিতে সন্তানকে নিজের মনের কথা লিখে জানিয়ে দিলেন অভিনেতা রাহুল ব্যানার্জি (Rahul Banerjee)। তার ছেলে সহজকে লেখা চিঠিতে রাহুল তুলে ধরেছেন তার এবং প্রিয়াঙ্কার (Priyanka Sarkar, রাহুলের স্ত্রী তথা অভিনেত্রী) অভিনয় জীবনের শুরুর দিনের সেই সংগ্রামের কথা। সেইসঙ্গে ছেলেকে খুব সুন্দরভাবে বর্তমান সময়কাল অনুসারে উপযুক্ত শিক্ষাও দিয়েছেন তিনি। কিভাবে? জানুন তার বয়ানে।

সহজকে রাহুল লিখেছেন, “জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। আমরা দু’জন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে— ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা”।

“এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি!”, পিতৃ দিবসের দূরে থেকেও ছেলেকে বার্তা দিলেন রাহুল।

তবে সহজের প্রতি তার মা অর্থাৎ প্রিয়াঙ্কার অবদানেরও কথাও এই বিশেষ দিনে স্মরণ করতে ভুললেন না রাহুল। ছেলেকে তিনি জানালেন, “যখন তুমি হলে, তোমার মায়ের আর একটা রূপ দেখলাম। তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা তোমাকে কোনও দিন বাজার চলতি বেবিফুড কিনে খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে বানাত। তাতে যদি সারা দিন লাগে, তো লাগুক। তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত”।

“আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট এস্থেটিক ছবি দেওয়ার পরেও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে ‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’ না, এ নিয়ে কোনও দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গিয়েছি। আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে”।

এই বিশেষ দিনে ছেলের প্রতি তার উপহার, “আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক’টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’— এ গুলো আলাদা করে জানত না, কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এ সব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত”।

রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা এখন আর একসঙ্গে থাকেন না। সহজ এখন মায়ের সঙ্গেই থাকে। সে যখন ভীষণ ছোট, তখনই তার বাবা-মা আলাদা হয়ে যান। রাহুলের আক্ষেপ, “তখন তুমি সদ্য মায়ের সঙ্গে আলাদা হয়েছ। প্রায় এক বছর পর তুমি আমাদের বেডরুমে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, ‘আমি এই ঘরে থাকতাম না বাবা?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম – হ্যাঁ। তুমি প্রশ্ন করেছিলে – ‘তার পর কী হল? এখন আর থাকি না কেন?’ বিশ্বাস করো, সেই প্রশ্নের উত্তর সে দিনও ছিল না, আজও নেই। ক্ষমা করো”।