কীভাবে ধ্বংস হয়েছিল বাবরি মসজিদ, মসজিদ তৈরির ইতিহাস ও ধ্বংসের কারণ

দিল্লির মসনদে তখন জহিরুদ্দিন মহম্মদ বাবর। বিশ্বস্ত সেনাপতি মির বাকি ১৫২৭ সালে অওধ দখল করে পরের বছর তাঁর মনিবের নামে সরযূ নদী পাড়ে বানালেন এক মসজিদ। চিতরের রানা সংগ্ৰামকে পরাজিত করে বাবরের সেনাপতি মীর বাকি বাবরের ইচ্ছায় অযোধ্যার রামকট দূর্গে এই মসজিদ স্থাপন করেন।‌ সাড়ে চার শতক পরে যা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

বাবরি মসজিদ তৈরির ইতিহাস

আশ্চর্যজনক ভাবে সমকালীন ‘বাবরনামা’ এবং আবুল ফজলের ‘আইন ই আকবরীতে’ (১৫৯৮) বাবরি মসজিদের কোনও উল্লেখ নেই। উল্লেখ নেই তুলসি দাসের রাম চরিতমানসেও (১৫৭৮)। ১৯৪০ পর্যন্ত এর নাম ‘বাবরি মসজিদ’ ছিল না, ছিল মসজিদ-ই-জন্মস্থান!

তার আগে এই মসজিদের নাম ছিল ‘মসজিদ-ই-জন্মস্থান’। ফৈজাবাদ জেলার ১৯০৫ সালের গ্যাজেট থেকে জন্য যায়, ১৮৫২ সালের আগে এই মসজিদ ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম নিদর্শন ছিল। হিন্দু এবং মুসলমান, দুই সম্প্রদায়ের মানুষই এই ভবনে প্রার্থনা করতে আসতেন।

বাবরি মসজিদের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় জয় সিংহের সময়ে ১৭১৭ সালে। যখন অযোধ্যার এই এলাকা মোগল দরবারের কাছ থেকে কিনে নেন। জেসুইট মিশনারি যোশেফ তিফেনথালের জানান (১৭৪৩-১৭৮৫) ওরঙ্গজেব রামকোট দূর্গ ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ করেন। কেউ কেউ বাবর মসজিদও বলে।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কারণ

১৮৫৩ সালে নির্মোহী আখরার সদস্যরা প্রথম রামজন্মভূমীর এলাকা দখল করে। দুই বছর ধরে হিন্দু মুসলমানের সাথে চলে ঝামেলা। ইংরেজ সরকার মন্দির বানানো নিষিদ্ধ করে দেয়। এলাকাকে ঘিরে দুই ভাগ করে দেওয়া হয় হিন্দু মুসলমানের মধ্যে প্রার্থনার জন্য। ১৮৮৩ সালে হিন্দুরা আবার হিন্দু মন্দির নির্মাণের চেষ্টা করে।

সেই সময় ব্রিটিশ সরকার দেওয়াল তুলে দুই সম্প্রদায়ের প্রার্থনার জায়গা পৃথক করে দেয়। সেখানেই সংঘাতের শুরু। এরপর দাবি তোলা হয় আওয়াধ অঞ্চলের বাবর-নিযুক্ত প্রশাসক মির বকশি অযোধ্যায় অবস্থিত প্রাচীন রামমন্দির ধ্বংস করে সেই মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর মসজিদের মধ্যে রাম সীতার মূর্তি স্থাপন করার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থকে চিঠি লিখে মসজিদ থেকে সেই মূর্তি অপসারণের নির্দেশ দেন।

এরপর ১৯৮৪ সালে যখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাবরি মসজিদের তালা খোলার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তার ঠিক পরের বছরই রাজীব গান্ধীর সরকার তালা খোলার নির্দেশ দেয়। ১৯৮৬ সালে মসজিদের তালা খোলার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ একদিকে রামমন্দির নির্মাণ কমিটি গঠন করেন এবং মসজিদে প্রার্থনা করার অনুমতি চায়। অন্যদিকে মুসলমানরা গড়ে তোলে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি। দুটি সম্প্রদায় ভাগ হয় রাষ্ট্র।

১৯৮৯ সালে সেই বিতর্কিত স্থানে ‘শিলান্যাস’ এর অনুমতি পায় ভিএইচপি। রাম রথযাত্রা করেন লাল কৃষ্ণ আদভানি।এর পরেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর এল কে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশি, বিনয় কাটিয়াসহ অন্যান্য নেতারা বিপুল পরিমাণ জনসমাগম নিয়ে মসজিদে পৌঁছোয় এবং উন্মত্ত জনতা সেখানে হামলা চালায়। এর পরই সম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে। সেই দাঙ্গায় প্রায় ১৮,০০০ মানুষ মারা যান। ভারতের সম্প্রীতির ইতিহাসে এটি অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়।

সম্প্রীতি ফেরানোর চেষ্টা

দুই পক্ষের মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব চরমে তখন ২০০২ সালে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী দুই পক্ষের মধ্যে সম্প্রীতি ফেরানোর চেষ্টা করেন এবং তৎকালীন জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহাকে হিন্দু ও মুসলমানদের নেতাদের সাথে পরামর্শের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বাবরি মসজিদের বর্তমান অবস্থা

২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দেয় যে সম্পূর্ণ এলাকা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ হবে। সম্পূর্ণ অঞ্চল তিন ভাগে ভাগ হবে যার একভাগ পাবে হিন্দু সম্প্রদায়, এক ভাগ পাবে মুসলিম সম্প্রদায় এবং বাকি এক ভাগ নির্মোহী আখড়ায় দেওয়া হবে।বিবাদ মূলত যে অংশকে নিয়ে, তা হিন্দুদের দেওয়ার কথা বলা হয়।

বাবরি মসজিদ রায়

২০১৯ সালে ৯ই নভেম্বর রাম জন্মভূমীর রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। হিন্দুরা তাদের জমিতে মন্দির বানাতে পারবে। আর মসজিদ তৈরির জন্য ৫ একর জমি দেওয়া হবে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ফলে দেশজুড়ে গোষ্ঠী সংঘর্ষে মারা যান ১৮,০০০ জন। এফআইআর দায়ের হয় লালকৃষ্ণ আডবাণী, উমা ভারতী, অশোক সিঙ্ঘল, গিরিরাজ কিশোর, বিষ্ণুহরি ডালমিয়া, মুরলীমনোহর জোশীদের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় মোট ৪৯ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১৭ জন মারা গিয়েছেন। ৮৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩৪ জন মৃত। অনেকে নিখোঁজ।

আরও পড়ুন : অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের তলায় ঠিক কি রয়েছে? কি বলছে ASI রিপোর্ট

আজ, বুধবার ২৮ বছর পর মসজিদ ধ্বংসের সেই মামলার রায় ঘোষণা করে বিশেষ সিবিআই আদালত। ২৮ বছর আগে বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এ বার বেকসুর খালাস হয়ে গেলেন সব অভিযুক্তরা। বিচারকের রায়, ওই ঘটনার পিছনে কোনও “ষড়যন্ত্র বা পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না”। “গোটাটাই ‘হঠাৎ ঘটে যাওয়া’ স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের ফল।”