পশ্চিমবঙ্গের ৭টি জাগ্রত কালী মন্দির; যেখানে গেলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেই

আজ শক্তি আরাধনার দিন। আদ্যশক্তি কালী মা’কে আজ ভক্তি ভরে  সারা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সকল ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুরা পূজা করবেন। মা কালী শক্তির অন্যতম উৎস রূপে শক্তির অন্যতম উৎস রূপে যুগ যুগ ধরে পূজিত হয়ে আসছেন। তান্ত্রিক মত থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণ্য মত সকল মতেই এই শক্তির আরাধনা করা হয় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। আমরা জানি সারাদেশ জুড়ে ৫১টি সতীপীঠ ছড়িয়ে আছে এবং সেই পীঠস্থানগুলিতে সারা বছরে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয়। পশ্চিমবঙ্গেও ছড়িয়ে আছে এরকম বিশেষ কিছু সতীপীঠ এবং জাগ্রত কালী মায়ের মন্দির। যেখানে ভক্তরা বারবার ছুটে যান মায়ের পূজার উপলক্ষে এবং মায়ের কাছে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার কামনা জানান। এই সব জাগ্রত সতীপীঠ এবং মন্দিরে মা ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন বলেই শত শত বছর ধরে এই সব মন্দিরের মাহাত্ম্য লোকমুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে । দীপান্বিতা কালীপূজার এই শুভ লগ্নে আজ আমরা আমাদের প্রতিবেদনা তুলে ধরব এইসব বিশেষ মন্দিরের নাম এবং মাহাত্ম্য কথা

কীর্তিশ্বরী মন্দির, মুর্শিদাবাদ

৫১ পীঠের অন্যতম মন্দিরগুলির মধ্যে এই মন্দির হল একটি। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত এই মন্দিরটি এই জেলার অন্যতম প্রাচীন কালী মন্দির। এই মন্দিরের পুরাতন কাঠামো বর্তমানে নষ্ট হয়ে গেলেও গেলেও নতুন আঙ্গিকে এই মন্দির গড়ে তোলেন ঊনিশ শতকে রাজা বা জমিদার দর্প নারায়ণ। অত্যন্ত জাগ্রত মন্দির বলে প্রসিদ্ধ সারা বাংলা জুড়ে এই মন্দির।

সারা মুর্শিদাবাদ তথা পশ্চিমবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে নানা ধর্মপ্রাণ ধর্মপ্রাণ থেকে নানা ধর্মপ্রাণ থেকে নানা ধর্মপ্রাণ মায়ের উপাসকরা এই মন্দিরে ভক্তিভরে পূজা দিয়ে যান দিয়ে যান এবং তাদের মনষ্কামনা পূর্ণ করেন বলেই এই মন্দিরের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাচীন এই মন্দিরটি মুক্তেশ্বরী মন্দির নামেও পরিচিত। দেবী সতীর মুকুট এই স্থানে স্থানে পড়েছিলে বলে মনে করা হয় এই মন্দিরে বিশেষ কোন বিগ্রহের পূজা করা হয় না একটি কালো পাথরকেই বিগ্রহ রূপে পূজা করা হয়ে থাকে।

কঙ্কালীতলা মন্দির, বোলপুর

৫১ পীঠের অন্যতম শেষ পীঠ এই মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের নিকট অবস্থিত। এখানে দেবী সতীর কঙ্কাল অথবা কোমর পড়েছিল পড়েছিল বলে মনে করা হয়। অত্যন্ত জাগ্রত এই মন্দিরটি কোন বিগ্রহ বা প্রতিমা পুজো করা হয়ে থাকে না। ভক্তিভরে সারা বছর ধরে প্রতিটি আমাবস্যায় এই মন্দিরে পূজা দিয়ে যান হাজার হাজার হাজার ভক্তরা। কথিত আছে এই মন্দিরে দেবী সতীর কোমর পড়েছিল এবং সেই  কোমরকে ভগবান শিব স্বয়ং এক কুন্ডের মধ্যে কুন্ডের মধ্যে মধ্যে এক কুন্ডের মধ্যে কুন্ডের মধ্যে মধ্যে গুপ্ত অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন।

আর তাই এই মন্দিরের কুণ্ডটি অত্যন্ত পবিত্র কুণ্ড বলে ধরা হয়ে থাকে। এছাড়াও বলা হয়ে থাকে এই কুন্ডলীর সঙ্গে  মণিকর্ণিকা  মণিকর্ণিকা নদীর গুপ্ত সংযোগ আছে এবং বছরের কোন সময়ই এই কুন্ডের জল শুকিয়ে যায় না এবং বর্ষাকালেও উপচে উপরেও উঠে না ।প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে বাৎসরিক পূজার সময় মা কালীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করা হয়ে থাকে। এছাড়াও মন্দির সংলগ্ন সংলগ্ন শ্মশান ঘাটে প্রতিদিন শত শত শব দাহ করা হয়ে থাকে। তবে বাৎসরিক পূজার সময় পূজা অনুষ্ঠান শুরু হয় না যতক্ষণ না পর্যন্ত এই শ্মশানে কোন শব দাহ করা না হয়।

কনকদুর্গা মন্দির, ঝাড়গ্রাম

পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম এর চিল্কিগড় এর এর অবস্থিত এই মন্দিরটি সমগ্র বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষদের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত মন্দির। মন্দিরটি জঙ্গলঘেরা গা-ছমছমে গা-ছমছমে এক জায়গার মধ্যে অবস্থিত ।কথিত আছে এই মন্দিরে পূর্বে নরবলি প্রথা চালু ছিল ।এই মন্দিরটি অত্যন্ত জাগ্রত একটি মন্দির ।এই মন্দিরে এসে মনষ্কামনা করলে তা মা পূরণ করেন বলে জানা যায়। শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরটির বজ্রপাতে সম্পূর্ণভাবে দ্বিখন্ডিত হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে নতুন করে নব মন্দির স্থাপনা করা হয়েছে। পূর্বের মন্দিরের পাশেই নতুন মন্দিরটি পূর্বমুখী।

পশ্চিমবঙ্গের ৭টি জাগ্রত কালী মন্দির; যেখানে গেলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেইপ্রাচীন মন্দিরের গায়ে আর্য এবং অনার্য ভাবধারার সংমিশ্রণ এবং উড়িষ্যা ঘরানার নিদর্শন দেখা যায়।প্রাচীন মন্দিরটি একটি বিষ্ণু মন্দির ছিল বলেই অনুমান করেন অনেকেই মন্দিরের শীর্ষে লাগা চক্র দেখে।ঢুলুঙ নদীর তীরেই অবস্থিত এই মন্দিরটি।এই মন্দিরের আরাধ্য দেবী কনক দুর্গা।এখানে দেবী দুর্গার মহাভোগে হাঁসের ডিমও দেওয়া হয়। পুরাতন  বর্তমানে পরিত্যক্ত এই মন্দিরটি চিল্কিগড় এর রাজা নির্মাণ করেছিলেন। কালিকা পুরাণ মতে এবং তন্ত্র মতে এই দেবীর নিত্য পূজা হয়ে থাকে হয়ে থাকে হয়ে থাকে এবং নিত্য পূজাতেও ডিম ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়াও মন্দির সংলগ্ন স্থানে নানা শিবলিঙ্গের দেখা মেলে এবং কথিত আছে এখানে ১০৮টি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন চিল্কিগড় এর রাজারা।

পশ্চিমবঙ্গের ৭টি জাগ্রত কালী মন্দির; যেখানে গেলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেই

সর্বমঙ্গলা মন্দির,গড়বেতা

কথিত আছে রাজা বিক্রমাদিত্য শব দেহের উপর বসে এই মন্দিরের দেবীকে তুষ্ট করেছিলেন। এছাড়াও জনমতে শোনা যায় এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা। এছাড়াও কথিত আছে এক রাতের মধ্যেই এই খানে সাতটি পুকুর খনন করা হয়েছিল এবং এই পুকুরের মধ্যেই এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। এই মন্দিরের আরাধ্য দেবী সর্ব মঙ্গলা এখানে দেবীর অষ্টধাতুর। দশোভূজা মূর্তি দেখা যায় যদিও পোশাকের এবং আবরণী দিয়ে ঢাকা থাকে তার দেহ।

পশ্চিমবঙ্গের ৭টি জাগ্রত কালী মন্দির; যেখানে গেলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেই

তারাপীঠ, বীরভূম

সারা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের অন্যতম সতীপীঠের একটি হলো তারাপীঠ । কথিত আছে এই মন্দিরে দেবী সতীর ত্রিনয়ন পড়েছিল। এখানে দেবী পূজিতা হন মা তারা রূপে। এই মন্দির জুড়ে নানা লোককথা প্রচলিত আছে। শোনা যায় সাধক বামাক্ষ্যাপা এই মন্দিরে মা তারার পূজা করতেন এবং পাশেই শ্মশান ক্ষেত্রে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এই মন্দিরে কোন বিগ্রহ পূজা করা হয় না, একটি পাথরকে বিগ্রহ রূপে পূজা করা হয়ে থাকে। যদিও এই পাথরের উপর মা তারার প্রতিকৃতি এবং পদচিহ্ন বসিয়ে ভক্তি সহকারে পূজা করা হয়ে থাকে। সারা বছর ধরে লক্ষ লক্ষ ভক্তরা এই মন্দিরে পূজা দিয়ে যান। এই মন্দিরের পাশেই শ্মশান ক্ষেত্র তান্ত্রিক এবং মন্ত্র সাধকদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জায়গা হিসেবে পরিগণিত হয়। কৌশিকী অমাবস্যার দিন এই মন্দিরে অত্যন্ত জনসমাগম হয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের ৭টি জাগ্রত কালী মন্দির; যেখানে গেলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবেই

দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির, কলকাতা

কলকাতা শহরের বিখ্যাত কালী মন্দির হল দক্ষিণেশ্বর হল দক্ষিণেশ্বর দক্ষিণেশ্বর মন্দির হল দক্ষিণেশ্বর হল দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির।১২৬২ বঙ্গাব্দে১৮ই জ্যৈষ্ঠ এবং ইংরেজি ১৮৫৫ খ্রি:৩১শে মে এই মন্দিরটি স্থাপনা করা হয়। এই মন্দিরের আরাধ্য দেবী হলেন ভবতারিণী দেবী।   রানী রাসমণি এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন । এই মন্দিরে দেবী কালীকে ভবতারিণী রূপে পূজা করা হয়। উনবিংশ শতাব্দীর পরম যোগী শ্রীরামকৃষ্ণ দেব এই মন্দিরে দেবী কালিকাকে মাতৃ রূপে পূজা করতেন। কথিত আছে রাণী রাসমণি মা কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দাদা রামকুমার ছিলেন এই মন্দিরের প্রথম এবং প্রধান পুরোহিত। মূল মন্দিরটি একটি নবরত্ন মন্দির। মূল মন্দির ছাড়াও এই মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে দ্বাদশ শিব মন্দির শিব মন্দির গুলি প্রত্যেকটি আটচালা শিবমন্দির।

কালীঘাট মন্দির, কলকাতা

সতীপীঠের অন্যতম একটি মন্দির হল কালীঘাট মন্দির । কথিত আছে এখানে পুরান মতে দেবী সতীর ডান পায়ের চারটি বা অনেকের মতে একটি অঙ্গুলি এই পীঠে পড়েছিল। কালীঘাটের এই মন্দিরটি হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এটি হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এটি নদীর তীরে অবস্থিত এটি প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এক মন্দির। এই মন্দিরের স্থাপন সম্পর্কে অনেক কথা লোকমুখে শোনা যায় ,কথিত আছে এই  হুগলি নদী তীরে এক ব্রাহ্মণ  সাধনা করছিলেন এবং তিনি  দেখেন নদীর নিকটস্থ একই স্থান থেকে অলৌকিক আলো আস্তে দেখেন তখন তিনি সেই উদ্দেশ্যে গমন করেন কাছে গিয়ে তিনি দেখেন একটি আঙ্গুলের মতো মূর্তি ।

আরও পড়ুন : কলকাতার এই কালী মন্দিরে ৩৪ বছর ধরে মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ

আরও পড়ুন : কালী পুজোর ইতিহাস, রূপের বর্ণনা, পূজা পদ্ধতি ও উপকরণ সম্পর্কে খুঁটিনাটি

তিনি সেটি তুলে নিয়ে এসে পূজা করতে শুরু করেন। মূল মন্দিরটি ৬ টি খন্ডে বিভক্ত নাটমন্দির,ষষ্ঠী তলা, হাড়কাঠতলা,রাধাকৃষ্ণ মন্দির,চোর বাংলা, কুন্ড পুকুর। বর্তমানে যে মূর্তিটি পূজা করা হয় সেটি কষ্টি পাথরের তৈরি।এছাড়াও সোনা এবং রুপার  অলংকার ধাতু নিয়ে এই মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। সালে এই মূর্তির জিভটি পাল্টানো হয় জীভটি ২কিলোগ্রাম রুপো এবং ৫১৬গ্রাম সোনা দিয়ে তৈরি করা। এছাড়াও দেবীর খড়গটি ২কেজি সোনা দিয়ে তৈরি। লোক মুখে শোনা যায় পূর্বে এই মন্দিরে নিয়মিত ছাগ বলি দেওয়া হতো। বর্তমানে বিশেষ বিশেষ দিনে এই ছাগ বলি দেওয়া হয়। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট দিনে দেবীকে স্নান করানো হয় যা “স্নানযাত্রা” নামে পরিচিত। ভক্তদের কাছে এই মন্দিরটি অত্যন্ত জাগ্রত মন্দির নামে পরিচিত।

আরও পড়ুন : মা কালীর জিভ বেরিয়ে থাকে কেন? কালীর পায়ের নীচে শিব থাকে কেন?

শক্তি আরাধনার এই বিশেষ দিনে আসুন আমরা ভক্তিভরে এইসব মন্দির দর্শন করার ইচ্ছা মনে মনে নিয়ে নিজেদের সুবিধা মতো করি ঘুরে আসি এইসব পুন্য তীর্থস্থান।  নিজেদের সকল মনোবাঞ্ছা পূরণ করার কামনা করি মায়ের মন্দিরে গিয়ে। অবশ্যই মনে রাখবেন মা কোন অসৎ কামনা পূর্ণ করেন না ।তাই মনের সকল কালিমা দূর করে আজকে ভক্তিভরে মাকে ডাকুন সৎ পথে নিজেকে পরিচালিত করার জন্য এবং মনের সকল কালিমা দূর করে সৎ সাহস এবং পরিশ্রমী হওয়ার জন্য। তবেই সফলতা বা সাফল্য অর্জন করবেন প্রত্যেকেই।শুভ কালী পূজা।