বিজয় মাল্য সম্পর্কে ৩০টি অজানা তথ্য, জানলে চোখ কপালে উঠবে আপনার

আবার খবরের শিরোনামে বিজয় মাল্য। তবে এবার সম্পুর্ন ব্যক্তিগত চালাকি এবং রাষ্ট্রের নির্বুদ্ধিতার জন্য। তিনি নাকি আজ থেকে ২বছর আগে লন্ডনে পালিয়ে যাওয়ার দুই দিন আগেই তৎকালীন এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির সাথে দেখা করেন, এবং তিনি ৯০০০ কোটি ঋণ  দেওয়া সকল ব্যাঙ্কের সঙ্গে একটি রফা করতে চেয়েছিলেন। লন্ডনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এমনই বিস্ফোরক সত্য স্বীকার করেছেন বিজয় মাল্য  নিজেই। আর তার পর থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ির খেলা। তবে এই কথার সত্যতা স্বীকার করে বিবৃতিও জানিয়েছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তবে এই রকম একটি অর্থ তছরূপের ঘটনা যে ঘটতে চলেছে  তা কি ভারতের কোন সংস্থা যেমন আয়কর দপ্তর, সেবি, বা গুপ্তচর সংস্থা যেমন সি বি আই বা আই বি বুঝতে পারে নি তা মোটেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা মেনে নিতে পারছি না।

এই ধরনের একজন ধন কুবের দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কাউকে কিছু না বলে তা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল। তাই সর্ষের মধ্যেই যে ভুত আছে , তা আর বলার দরকার পড়ে না। কিন্তু আমরা এইভাবেই সরকার থেকে শিল্পপতি সকলের কাছেই প্রতারনার স্বীকার হয়ে চলেছি। আমাদের ব্যাংকে টাকা রাখলে ন্যূনতম টাকা না রাখার জন্য কষ্টার্জিত টাকা থেকেও জরিমানা দিতে হচ্ছে। আর অন্য দিকে বাবু সেজে নবাবি ঠাট দেখিয়ে দেশের সরকারকেই বোকা বানিয়ে ৯,০০০ কোটি টাকার মতো টাকা নিয়ে বিদেশের মাটিতে পা দিলেন এই বড় ডাকাত নাম যার বিজয় মাল্য । আসুন আমরা আজ এই ডাকাতের জীবনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

১৯৫৫সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া বর্তমানে ৬৩ বছরের  খলনায়ক হলেন বিজয় মাল্য। পুরো নাম বিজয় ভিত্তল মালিয়া।তিনি জন্মসূত্রেই এক অভিজাত এবং শিল্পপতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন ভিত্তল মালিয়া এবং মায়ের নাম ললিতা রামাইয়া মালিয়া। বাবা ভিত্তল  মালিয়া ছিলেন ভারতের সবচেয়ে বড় স্পিরিট কোম্পানি ইউনাইটেড ব্রেওয়ারিজ বা ইউ বি গ্রুপ এর কর্ণধার।

বিজয় মাল্য  কলকাতার লা মার্তিনিয়া বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় থেকে তার ছাত্রজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি  সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাণিজ্যে সাম্মানিক স্নাতক নিয়ে পাশ করেন ১৯৭৬ সালে।

বিজয় মাল্যর যখন ২৮ বছর বয়স, তখন তার বাবার অকস্মাৎ মৃত্যু হওয়ার জন্য তিনি তাদের পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করার কাজে প্রত্যক্ষভাবে চলে আসেন। সেই বছরই তিনি ইউ বি গ্রূপের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

বিজয় মাল্যর বিবাহিত জীবন বিশেষভাবে আলোচিত। ৩১ বছর বয়সে প্রথমবার বিবাহ হয়েছিল। বর্তমানে তার দ্বিতীয়বার বিবাহ হওয়ার পরও তৃতীয় বিবাহের  খবর শোনা যাচ্ছে। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন একজন এয়ার ইন্ডিয়ার এয়ার হোস্টেস সমীরা তায়াবজি। তাদের সন্তানের নাম সিদ্ধার্থ মালিয়া।

প্রথম স্ত্রীর সাথে তার সম্পর্ক বেশি দিন টেকে নি। ৩৮ বছর বয়সে রেখা নামের এক বাল্য বান্ধবী যার ইতিমধ্যেই দুবার বিবাহ হয়ে গিয়েছিল, সেই দুইবার ডিভোর্সী মহিলাকে বিবাহ করেন। রেখার প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের বিবাহের একটি মেয়ে এবং ছেলে ছিল। বিবাহের পর মালিয়া লায়লাকে নিজের কন্যা রূপে মেনে নেন।

বর্তমানে সোনা যাচ্ছে বিজয় মাল্য তৃতীয় বিবাহ করেছেন। এবার তার স্ত্রী হয়েছেন আরও একজন এয়ার হোস্টেস পিঙ্কি লালওয়ানী।

বিজয় মাল্য তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য তরল নেশার পানীয় থেকে রিয়েল এস্টেট, সার, ওষুধ, রং ব্যবসা, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বিমান পরিবহন ইত্যাদিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ২০০৫ সালে বিজয় মাল্য  তার বর্তমানের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যবসা কিংফিসার এয়ার লাইন শুরু করেন। তৎকালীন কেন্দ্রে সরকার ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ সরকার।

২০১৩ সালে তিনি এই ব্যবসা গোটাতো বাধ্য হন, কারন তার আগের ১৫ মাস  বিমানের পাইলট এবং অন্যান্য কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেন নি। তাছাড়া বাজারে তার ধারের পরিমান হয়ে দাঁড়ায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার।

২০১৫ সাল পর্যন্ত তার বিভিন্ন ব্যাংকে এবং বাজারে ঋণের পরিমাণ হয়ে দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। যার মধ্যে ভারতীয় ১৭ টি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৭,০০০ কোটি টাকা।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে বিজয় মাল্য  দেশ ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে যান তার ছেলেমেয়েদের সাথে সময় কাটানোর নাম করে। ২০১৬ সালের ১৩ ই মার্চ হায়দারাবাদের এক দায়েরা আদালত বিজয় মাল্যর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তার দেশীয় আইনজীবী উচ্চতর আদালতে এর বিরুদ্ধে আবেদন জানান।

পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ১৮ই এপ্রিল মুম্বাইয়ের এক আদালতে একই রকম তারিখহীন জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট বা ই ডি এর এক আবেদনের ভিত্তিতে টাকা তছরূপের অভিযোগে।

পরবর্তী সময়ে ই ডি বিজয় মাল্যর ভারতীয় সম্পত্তির ১৪১১ কোটি টাকা নিজেদের অস্থায়ী অধীনে  নিয়ে নেয়, ব্যাঙ্কের ঋণের ৮০৭ কোটি টাকা উদ্ধারের পদক্ষেপ হিসাবে ১১ই জুন ২০১৬ সালে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ই ডি এক রিপোর্টে জানায়, তারা দ্বিতীয় অধিগ্রহণ হিসাবে ৬,৬৩০ কোটি টাকা মূল্যের বিজয় মাল্যর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। যার মধ্যে তার একটি খামার বাড়ি, এবং ইউ বি গ্রূপের তার অধীনস্ত শেয়ার বা মালিকানা, এবং বেঙ্গালুরুতে তার মালিকানায় থাকা একাধিক ফ্ল্যাট বাড়ি  যাদের বর্তমান বাজার মূল্য ৫৬৫ কোটি টাকা।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ই ডি তাদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায় তারা বিজয় মাল্য র মোট ৯৬৬১ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। যা এখনও পর্যন্ত ই ডি দ্বারা টাকা তছরূপের অভিযোগে বাজেয়াপ্ত করা কোন সম্পত্তির সর্বাধিক মূল্য। ফোর্বস পত্রিকার হিসাবে বিজয় মাল্যর মোট  ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমান ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার।

বিজয় মাল্য তার রাজনৈতিক জীবনে প্রথমে অখিল ভারতীয় জনতা দলের একজন সদস্য ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি শুভ্রমনিয়াম স্বামী নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টিতে যোগদান করেন। ২০০২ সালে তিনি কর্ণাটক থেকে একজন স্বাধীন সদস্য হিসেবে কংগ্রেস এবং জনতা দল সেকুলারের সমর্থনে রাজ্য সভার একজন সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন।

২০১০ সালে তিনি দ্বিতীয় বারের জন্য রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন ভারতীয় জনতা পার্টি এবং জনতা দল সেকুলারের সমর্থনে।২০১৬ সালের ২রা মে বিজয় মাল্য  রাজ্য সভার সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেন।

বিজয় মাল্যর নাম পানামা পেপার, পেরাডাইজ পেপার প্রভৃতির মতো ফাঁস হওয়া গোপন ডকুমেন্টে পাওয়া গিয়েছে যেখানে টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এই জালিয়াতকে ১৯৯৭ সালে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় Southern California University Of Professionals Studies নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও ফ্রান্সের উচ্চ সম্মানে তিনি ভূষিত হন।

বিজয় মাল্যর লন্ডনের বাড়িতে সোনার কমোড আছে বলে খবর জানা যায়। এছাড়াও তার কাছে গান্ধীর চশমা এবং টিপু সুলতানের ব্যবহৃত তলোয়ার আছে বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে।

বিজয় মাল্যকে একজন ধর্মপ্রান মানুষ হিসাবে  জানা যায়। তিনি ভারতে থাকাকালীন প্রতি বছর শবরীমালা মন্দির দর্শনে যান বলে জানা যায়। এছাড়াও তিনি তিরূপতি মন্দিরে ঠাকুর দর্শন করেছেন বলেও জানা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় কোন ভগবান তাকে জালিয়াতি করতে বাধা দিতে পারলো না।

টেক সেভি বিজয় মাল্যর কাছে ব্ল্যাকবেরি কোম্পানির সর্বোচ্চ মূল্যের মোবাইল সেট দেখতে পাওয়া যায়। তার মালিকানায় বিশ্বের আধুনিকতম প্রমোদ তরী Indian Empress yacht আছে। এই প্রমোদতরী ভ্রমণের এক সপ্তাহের খরচ ৭,৫০,০০০টাকা। এই প্রমোদ তরীর মধ্যেই সিনেমাহল, জিমনেসিয়াম, পিয়ানো রুম, ম্যাসাজ নেওয়ার সুবিধা এবং আরও আধুনিক বিলাসবহুল পরিষেবা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন : নীরব মোদি সম্পর্কে ১০ টি অজানা তথ্য

২০১৪ সালে লন্ডনের এক নিলামে টিপু সুলতানের এক তলোয়ার ১,৭৫,০০০ পাউন্ডে যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১.৫ কোটি টাকার কিনে নেন। এছাড়াও ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কে এক নিলামে মহাত্মা গান্ধীর একটি চশমা এবং অন্যান্য ব্যবহৃত জিনিস ১৮ লক্ষ মার্কিন ডলার দিয়ে কিনে নেন।

আরও পড়ুন : ভারতীয় ব্যাঙ্ক দুর্নীতি তে ভর্তি কেন? 

বিজয় মাল্যর মালিকানা সংস্থা একসময় ভারতের বিখ্যাত ফুটবল টিমের ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, এছাড়াও ক্রিকেটে রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু নামের আই পি এল ক্রিকেট টিম এবং ফর্মুলা ওয়ান ভারতীয় দলে তাদের লগ্নি করেছিল।

 

বিজয় মাল্য ৭টি ভাষায় কথা বলতে পারেন। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, কন্নড়, কঙ্কনি, গুজরাটি, এবং বিদেশি ভাষা ফরাসিতে তিনি কথা বলতে দক্ষ।