ভারতের পবিত্র ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ এর নাম, অবস্থান ও সৃষ্টির ইতিহাস

যে সমস্ত শিবলিঙ্গ স্বয়ম্ভু--অর্থাত্‍ নিজেই স্বয়ং শিবলিঙ্গরূপে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, এইরূপে সারা ভারতবর্ষে ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গ আছে, সেই সব শিবলিঙ্গকে বলা হয় জ্যোতির্লিঙ্গ।

ভারত ধর্মের দেশ। ভারত মন্দিরের দেশ। প্রাচীন যুগ থেকেই ভারতে চলে আসছে দেবতাদের প্রতি পূজা অর্চনা করার প্রথা।আর তাই ভারতকে বলা হয় তেত্রিশ কোটি দেবতাদের দেশ। আর এই দেবতাদের মধ্যে অন্যতম দেবতা হলেন দেবাদিদেব মহাদেব।

সারা ভারত  জুড়েই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য শিব মন্দির। গ্রাম গঞ্জ থেকে শুরু করে শহর, নগর সব জায়গাতেই।সমতল ভুমিরূপেই যে এই ঈশ্বরের মন্দির  আছে তা নয়।পার্বত্য অঞ্চলেও তিনি সমানভাবে বিরাজমান।তবে সারা ভারত জুড়ে প্রথমদিকে মনে করা হত জ্যোতির্লিঙ্গের সংখ্যা ৬৪। এর মধ্যে ১২টিকে পবিত্রতম বলে গণ্য করা হয়। তিনি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে পূজিত হয় বারোটি জায়গায়।  

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী , অরিদ্রা নক্ষত্রের রাতে শিব স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।  তার কারণ হিসাবে এক গল্পের বর্ণনা আছে।

শিব মহাপুরান অনুযায়ী গল্পটি হল একবার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্ম ও রক্ষাকর্তা বিষ্ণুর মধ্যে তর্ক হয়েছিল।তর্কের বিষয় ছিল তাঁদের মধ্যে জগতে কে শ্রেষ্ঠ ?।তাঁদের পরীক্ষা করার জন্য শিব বিচারকের ভূমিকায়  ছিলেন।তিনি ত্রিভুবনকে একটি অনন্ত আলোর লিঙ্গ বা জ্যোতির্লিঙ্গ দ্বারা বিভক্ত করেছিলেন।তিনি তাদের কাছে এই জ্যোতির্লিঙ্গ এর অন্ত খুঁজে বের করতে বলেন। বিষ্ণু ও ব্রহ্মা দুই দিকে সেই লিঙ্গের উৎস খুঁজতে বের হন। ব্রহ্মা মিথ্যা বলেন যে তিনি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্ত খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু বিষ্ণু পরাজয় স্বীকার করে নেন। শিব দ্বিতীয় জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হন।তবে মিথ্যা বলার জন্য ব্রহ্মাকে শাপ দেন যে কোনো অনুষ্ঠানে তাঁর স্থান থাকবে না। অন্যদিকে তিনি বিষ্ণুকে আশীর্বাদ করেন যে বিষ্ণু প্রলয়কাল অবধি পূজিত হবেন। জ্যোতির্লিঙ্গ হল সর্বোচ্চ অখণ্ড সত্য। যাতে শিব আংশিকভাবে আবির্ভূত হন।  এই জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলি সেইখানেই গড়ে উঠেছে যেখানে শিব আলোর অগ্নিময় লিঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।প্রত্যেকটি জ্যোতির্লিঙ্গের পৃথক পৃথক নাম আছে। এগুলিকে শিবের বিভিন্ন রূপভেদ মনে করা হয়।প্রত্যেক মন্দিরেই  শিবলিঙ্গ শিবের অনন্ত প্রকৃতির প্রতীক। আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের প্রতিনিধিত্ব করে ।এই শিবলিঙ্গগুলির বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। তবে হিন্দুদের কাছে এগুলি শিবের পবিত্রতম মন্দির।

১. সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ

সোমনাথ শব্দটির অর্থ “চন্দ্র দেবতার রক্ষাকর্তা”। সোমনাথ মন্দিরটি ‘চিরন্তন পীঠ’ নামে পরিচিত।  গুজরাট রাজ্যের সৌরাষ্ট এর নিকট প্রভাস ক্ষেত্রে অবস্থিত এই মন্দির অন্যতম উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্লিঙ্গ নামে সারা ভারতে পরিচিত ।সারা বিশ্ব ও ভারত জুড়ে অসংখ্য পুণ্যার্থী ও ভক্ত আসেন এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন ও পূজা নিবেদন করতে। অতীতে এই শিব মন্দির বারবার বিদেশী শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রায় পাঁচবার বা তার বেশিবার এই মন্দির পুনর্নির্মিত  করা হয়।

মন্দির সৃষ্টির পেছনে পৌরানিক কারণ

সোমনাথ মন্দিরের আরাধ্য দেবতা শিব।তিনি সোমেশ্বর মহাদেব নামেও পরিচিত। পুরাণ অনুসারে, তিনি সত্য যুগে সোমেশ্বর মহাদেব ভৈরবেশ্বর নামে,  ত্রেতা যুগে শ্রাবণিকেশ্বর  নামে ও দ্বাপর যুগে শ্রীগলেশ্বর নামে পরিচিত ছিলেন। চন্দ্র তাঁর স্ত্রী রোহিণীর উপর অত্যধিক আসক্ত ছিল।তাই  তাঁর অন্য ছাব্বিশ স্ত্রীকে উপেক্ষা করতে থাকে। এই ছাব্বিশ জন ছিল দক্ষ প্রজাপতির কন্যা। এই কারণে দক্ষ তাঁকে ক্ষয়িত হওয়ার অভিশাপ দেয়। চন্দ্র এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রভাস তীর্থে চন্দ্র শিবের আরাধনা করে।শিব তার আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর অভিশাপ অংশত নির্মূল করে। এরপর ব্রহ্মার উপদেশে কৃতজ্ঞতাবশত চন্দ্র সোমনাথে একটি স্বর্ণ শিবমন্দির নির্মাণ করে। পরে  রাবন রৌপ্যে, ও কৃষ্ণ চন্দনকাষ্ঠে এবং রাজা ভীমদেব প্রস্তরে মন্দিরটি পুনর্নিমাণ করেছিল।

২. মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ

দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের শ্রীশৈলমে অবস্থিত মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গ এক প্রসিদ্ধ শিব মন্দির।মন্দিরটি পূর্বমুখী। কেন্দ্রীয় মণ্ডপে অনেকগুলি স্তম্ভ এবং নন্দীকেশ্বরের একটি বিরাট মূর্তি আছে।দক্ষিণ ভারতের সকল হিন্দুদের কাছে এই মন্দির অনেক পবিত্র।সারা বছর ধরে এখানে অনেক অনেক ভক্ত আসেন নিজের মনস্কামনা পূর্ন করতে ও বাবা শিবের লিঙ্গে জল অর্পণ করতে।শিবরাত্রি এই মন্দিরের প্রধান উৎসব।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

শিব ও পার্বতীর দুই ছেলে। তারা হল কার্তিক ও গনেশ। তাদের বাবা মা তাদের  জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছিল। কার্তিক সেই সময় তর্ক জুড়েছিল কে আগে বিয়ে করবেন সেই নিয়ে। শিব বলে, যে আগে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে তারই আগে বিয়ে হবে। কার্তিক তাঁর বাহনে চেপে বিশ্ব প্রদক্ষিণে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু গণেশ শিব ও পার্বতীকেই সাত বার প্রদক্ষিণ করে। কারণ,  গনেশ ছিল বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ।সে জানত শাস্ত্রমতে নিজের পিতামাতাকে প্রদক্ষিণ করলে ভূপ্রদক্ষিণ করা হয়। শিব বুদ্ধি, সিদ্ধি ও ঋদ্ধির সঙ্গে গণেশের বিয়ে দেয়। কার্তিক ফিরে এসব দেখে রেগে যায়।সে ক্রৌঞ্চ পর্বতে কুমারব্রহ্মচারী নামে বাস করতে চলে যায়। শিব কার্তিককে শান্ত করতে আসে। তা দেখে তিনি অন্যত্র চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দেবতাদের অনুরোধে সে কাছাকাছিই থেকে যায়। শিব ও পার্বতী যেখানে ছিল সেই জায়গাটি শ্রীশৈলম নামে পরিচিত হয়। শিব অমাবস্যায় ও পার্বতী পূর্ণিমায় কার্তিককে দেখতে আসত।

৩. মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ

মধ্য প্রদেশের মধ্যে অবস্থিত  মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ অন্যতম শিব মন্দির।এখানে সারা বছর অসংখ্য পুণ্যার্থী আসেন এই মন্দিরে পূজা দিতে।এটিই একমাত্র দক্ষিণমুখী মন্দির। মহাকালেশ্বরের মূর্তিটি  ‘দক্ষিণামূর্তি’।এই শব্দের অর্থ ‘যাঁর মুখ দক্ষিণ দিকে’। এই মূর্তির বিশেষত্ব এই যে” তান্ত্রিক শিবনেত্র “প্রথাটি বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে একমাত্র মহাকালেশ্বর মন্দিরে দেখা যায়। ‘ওঙ্কারেশ্বর মহাদেবে’র মূর্তিটি মহাকাল মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরে স্থাপিত। গর্ভগৃহের পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব দিকে যথাক্রমে গনেশ, পার্বতী ও কার্তিকের মূর্তি স্থাপিত আছে।  দক্ষিণ দিকে শিবের বাহন  নন্দীর মূর্তি স্থাপিত আছে।। মন্দিরের তৃতীয় তলে  নাগচন্দ্রেশ্বর মূর্তি আছে। এটি একমাত্র  নাগ পঞ্চমীর দিন দর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মন্দিরের পাঁচটি তল আছে। তার মধ্যে একটি ভূগর্ভে অবস্থিত। এছাড়া মন্দিরে একটি বিশাল প্রাঙ্গন রয়েছে। হ্রদের দিকে অবস্থিত এই প্রাঙ্গনটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মন্দিরের শিখর বা চূড়াটি শাস্ত্রে উল্লিখিত পবিত্র বস্ত্র দ্বারা ঢাকা থাকে। ভূগর্ভস্থ কক্ষটির পথটি পিতলের প্রদীপ দ্বারা আলোকিত হয়। মনে করা হয়, দেবতাকে এই কক্ষেই প্রসাদ দেওয়া হয়। এটি মন্দিরের একটি স্বতন্ত্র প্রথা। কারণ, এই রকম প্রথা অন্য কোনো মন্দিরে দেখা যায় নামন্দিরের গর্ভগৃহে যেখানে শিবলিঙ্গটি রয়েছে সেখানে সিলিং-এ একটি  শ্রীযন্ত্র উলটো করে ঝোলানো থাকে।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

ভারতীয় পুরাণ অনুযায়ী উজ্জয়িনী শহরটির নাম ছিল অবন্তিকা। এই শহরটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং ধর্মীয় চিন্তার কেন্দ্র।  উজ্জয়িনীতে চন্দ্রসেন নামে এক শাসক ছিল। সে ছিলেন অত্যন্ত শিবভক্ত। একদিন শ্রীখর নামে এক কৃষকবালক প্রাসাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনতে পায় রাজা শিবের নাম করছে। সেও ছুটে মন্দিরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রার্থনা শুরু করে দেয়। প্রহরীরা তাকে টেনে সেখান থেকে বের করে শহরের বাইরে শিপ্রা নদীর তীরে রেখে দিয়ে আসে। উজ্জয়িনীর পার্শ্ববর্তী দুই শত্রুরাজ্যের রাজা রিপুদমন ও সিংহাদিত্য সেই সময় উজ্জয়িনীর সম্পদের লোভে রাজ্য আক্রমণের কথা ভাবছিল। এই কথা শুনে শ্রীখর প্রার্থনা শুরু করে। সেই খবর পৌঁছায় বৃধি নামে এক পুরোহিতের কাছে। সে এই কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় এবং ছেলেদের একান্ত অনুরোধে শিপ্রা নদীর তীরে গিয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা শুরু করে।  ব্রাহ্ম এর আশীর্বাদে দূষণ নামে এক দৈত্য অদৃশ্য হয়ে যাবার ক্ষমতা পেয়েছিল। শত্রুরাজারা দূষণের সাহায্যে উজ্জয়িনী আক্রমণ করে। যুদ্ধে তাঁদেরই জয় হয় এবং তাঁরা সকল শিবভক্তের উপর অত্যাচার শুরু করে দেয়।অসহায় ভক্তদের প্রার্থনা শুনে শিব মহাকালের রূপে উজ্জয়িনীতে আবির্ভূত হয়ে চন্দ্রসেনের শত্রুদের ধ্বংস করে। শ্রীখর ও বৃধির অনুরোধে শিব উজ্জয়িনীতে বাস করতে রাজি হয়। তিনিই হন রাজ্যের প্রধান দেবতা এবং শিবভক্তদের রক্ষাকর্তা। সেই থেকে উজ্জয়িনীতে মহাকাল রূপে শিব তাঁর শক্তি পার্বতীকে নিয়ে বাস করছেন।

৪. ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ

মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর একটি দ্বীপে ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ও মামল্লেশ্বর মন্দির অবস্থিত।মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর স্টেশন থেকে ৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ পাঁচতলা মন্দিরের গর্ভগৃহে ছোট্ট শিবলিঙ্গ৷ সামান্য উচ্চতা৷ জাতিধর্ম নির্বিশেষে স্পর্শ করে পূজো দেওয়া যায়৷ সারা বছর ধরেই অনেক পুণ্যার্থী আসেন পূজা দিতে।

৫. কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ

চারধামের অন্যতম কেদারনাথ।এটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল হিমালয় পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত।এটি একটি মন্দির শহর ও বটে। এটি  মন্দাকিনী নদীর তীরে স্থাপিত ।এখানকার তীব্র শীতের জন্য মন্দিরটি কেবল এপ্রিল মাসের শেষ থেকে কার্তিক পূর্ণিমা অবধি খোলা থাকে। শীতকালে কেদারনাথ মন্দিরের মূর্তিগুলিকে ছয় মাসের জন্য  উখি মঠে নিয়ে গিয়ে পূজা করা হয়। এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম ছিল কেদারখণ্ড ; তাই এখানে শিবকে কেদারনাথ (অর্থাৎ, কেদারখণ্ডের অধিপতি) নামে পূজা করা হয়।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

যদিও বর্তমানে অনেক লোকের বিশ্বাস,  আদি শংকর বর্তমান স্থানে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিল।যদিও  মহাভারতেও কেদারনাথ মন্দিরের উল্লেখ আছে।  কথিত আছে, পান্ডবেরা এখানে তপস্যা করে শিবকে তুষ্ট করে।

৬. ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ

মহারাষ্ট্রে অবস্থিত অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিবলিঙ্গ মন্দির এটি।ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ ঠিক কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে। মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে একটি ভীমাশঙ্কর মন্দির রয়েছে । এই অঞ্চলটি প্রাচীনকালে ডাকিনী দেশ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু উত্তরাখণ্ডের কাশীপুরও প্রাচীনকালে ডাকিনী দেশ নামে পরিচিত ছিল। এখানে মোটেশ্বর মহাদেব নামে একটি ভীমশঙ্কর মন্দির আছে। ভীমশঙ্কর মন্দিরের অন্যান্য দাবিদার মন্দিরগুলি  হল মহারাষ্ট্রের সহ্যাদ্রি, অসমের গুয়াহাটির কাছে ও ওড়িশার গুনুপুরে অবস্থিত।গ্রহের বাঁধা কাটানো ও অকাল মৃত্যু রোধ করার অসংখ্য ভক্ত আসেন এখানে।জঙ্গলের মধ্যে ঘন গ্রানাইট পাথরের তৈরি এই মন্দির।এই মন্দিরের লিঙ্গ মাঝারি  আকারের।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

ভীমা নামক এক অসুর বধ করেন বাবা শিব এখানে।তার ভক্ত কামরূপেশ্বরকে বাঁচানোর জন্য।

৭. কাশী বিশ্বনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ

উত্তরপ্রদেশের কাশীতে অবস্থিত  অন্যতম জনপ্রিয় জ্যোতির্লিঙ্গ হল বিশ্বনাথ শিবলিঙ্গ।মন্দিরটি শৈবধর্মের প্রধান কেন্দ্রগুলির অন্যতম। অতীতে বহুবার এই মন্দিরটি বিভিন্ন আক্রমণে  ধ্বংসপ্রাপ্ত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের পাশে জ্ঞানবাপী মসজিদ নামে একটি মসজিদ রয়েছে। আদি মন্দিরটি এই মসজিদের জায়গাটিতেই অবস্থিত ছিল।বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে  ইন্ডোরের মহারানি  অহল্যা বাই হোলকর তৈরি করে দেন।মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব।এখানে “বিশ্বনাথ” বা “বিশ্বেশ্বর” নামে পূজিত হয়। বারাণসী শহরের অপর নাম “কাশী” এই কারণে মন্দিরটি “কাশী বিশ্বনাথ মন্দির” নামে পরিচিত। মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনায় মোড়া। তাই মন্দিরটিকে স্বর্ণমন্দিরও বলা হয়ে থাকে। ১৯৮৩ সাল থেকে উত্তরপ্রদেশ সরকার এই মন্দিরটি পরিচালনা করে আসছেন।হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, গঙ্গায় একটি ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন করলে মোক্ষ লাভ করা সম্ভব।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

শৈব সাহিত্যে দক্ষ যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা শক্তিপীঠের উৎস-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক আখ্যান।কথিত আছে, সতীর দেহত্যাগের পর শিব মণিকর্ণিকা ঘাট দিয়ে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে এসেছিল। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়  স্কন্দ পুরাণে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

৮. ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ

মহারাষ্ট্রের নাসিকের কাছে গোদাবরী  নদীর উৎসের কাছে অবস্থিত এই জ্যোতির্লিঙ্গ অন্যতম জনপ্রিয় ।এই লিঙ্গমূর্তি তিন ভাগে বিভক্ত এবং অন্য শিবলিঙ্গের চেয়ে আলাদা৷এই মন্দিরের পুননির্মাণ নানাসাহেব ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে করেন।তখন এই মন্দির নির্মাণ করতে খরচ হয়েছিল সেইসময়কার ১৬ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছিল।যা তখনকার হিসেবে অনেক অনেক টাকা।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

পৌরানিক কথা অনুযায়ী একবার মহর্ষি গৌতমের  স্ত্রী অহল্যার সঙ্গে তাপবনে থাকা বাকি ব্রাহ্মনের স্ত্রীদের কোনো একটি বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়ে গিয়েছিল।ব্রাহ্মনরা চাইছিল তাকে আশ্রম থেকে নির্বাসিত করতে।তখন তারা গনেশ দেবতার আরাধনা শুরু করে সকলে।গনেশ দেবতা প্রসন্ন হলে ,তারা গনেশ দেবতার কাছে বর চান যেন, তিনি ঋষি গৌতম ও তার স্ত্রীকে ওই আশ্রম থেকে বিতাড়িত করে।তখন গনেশ নিরুপায় হয়ে এক অসুস্থ গাভীর রূপ ধারণ করে ।এবং ঋষির মাঠের কাছে চরতে থাকেন।ঋষি তাকে দেখে কিছু খাবার খাওয়াতে গেলে ওই গাভীর মৃত্যু হয়।তখন গোহত্যার দায়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।তিনি কিছু দূরে গিয়ে থাকতে শুরু করেন।তিনি গো হত্যার দায় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সারা পৃথিবী তিনবার প্রদক্ষিণ করেন।তার এই কঠোর ত্যাগে দেখে  মহাদেব শিব প্রসন্ন হন।তাকে তার গোহত্যার পুরো ঘটনা খুলে বলেন।তিনি সব শুনেও সকল ব্রাহ্মনদের ক্ষমা করে দেন।সকল দেবতা এই ঘটনা দেখে শিবের কাছে অনুরোধ করেন,তিনি যেন ঋষি গৌতমের কাছাকাছি থেকে যান।তাই তিনি ত্র্যম্বকেশ্বর নামে ওইখানেই থেকে যান।এই শিবলিঙ্গ ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ নামে পরিচিত।

৯. বৈদনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ

এই মন্দিরটি  ঝাড়খন্ড রাজ্যের দেওঘর জেলায় দেওঘর শহরে অবস্থিত। অবস্থিত এই মন্দির  খুবই প্রসিদ্ধ।অসংখ্য পুণ্যার্থী সারা বছর ধরেই এখানে আসেন, শিবলিঙ্গে জল ঢালেন ও পূজা দেন।শ্রাবন মাসে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়।বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থানও বিতর্কিত। ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের বৈদ্যনাথ মন্দিরটি জ্যোতির্লিঙ্গ আখ্যাপ্রাপ্ত। এটিই একমাত্র তীর্থ যা একাধারে জ্যোতির্লিঙ্গ ও শক্তিপীঠ। বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যান্য দাবিদার মন্দিরগুলি হল হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলার বৈজনাথ শিবধাম ।মহারাষ্ট্রের বিড জেলার পারলি বৈজনাথ।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

হিন্দু পুরাণের বিশ্বাস অনুসারে, লঙ্কারাজ  রাবন এখানে শিবকে খুশি করার জন্য তপস্যা করেছিল। সে তাঁর দশটি মাথা একটি একটি করে কেটে যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিচ্ছিল। এতে শিব সন্তুষ্ট হয়ে আহত রাবণকে সুস্থ করে তুলতে আসে। শিব যেহেতু এখানে বৈদ্য বা চিকিৎসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তাই এখানে শিবকে বলা হয় বৈদ্যনাথ।

অন্য  মত অনুসারে, রাজা লঙ্কেশ রাবন চেয়েছিল যে তাঁর রাজধানী হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ । সে তার সকল শত্রুর থেকে হবে  মুক্ত। তাঁর মনে হয়েছিল, যদি শিব সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু না করে, তবে তা হওয়া সম্ভব ।  তাই সে শিবের তপস্যা শুরু করে। তখন শিব  তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে একটি শিবলিঙ্গ লঙ্কায় প্রতিষ্ঠার জন্য দান করে। শিব বলেছিল, লিঙ্গটি অন্য কোথাও যেন স্থাপন না করা হয় এবং অন্য কারোর হাতে না দেওয়া হয়। এমনকি লঙ্কায় যাত্রাপথেও কোথাও যেন না থামা নয়। রাবণ যদি অন্য কোথাও পৃথিবীতে এই লিঙ্গটি স্থাপন করে, তবে সেটি সেখানেই চিরতরে থেকে যাবে। রাবণ খুশি হয়ে লিঙ্গটি নিয়ে লঙ্কার পথে যাত্রা করে।অন্যান্য দেবতারা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করল। শিব যদি রাবণের সঙ্গে লঙ্কায় যান, তবে রাবণ অজেয় হবে। তখন সে পৃথিবীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালাবে। তাই তাঁরা রাবণকে ছলনা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করল। দেবতারা জলদেবতা বরুণকে রাবণের মূত্রথলিতে প্রবেশ করতে অনুরোধ করল। তখন  কৈলাস পর্বত থেকে ফেরার পথে রাবণের মুত্রের বেগ পেল। তখন তিনি এমন কাউকে খুঁজতে লাগল, যাকে খানিকক্ষণের জন্য লিঙ্গটি ধরতে দেওয়া যায়। তখন ভগবান বিষ্ণু ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে রাবণের কাছে এল। রাবণ তাঁর হাতেই লিঙ্গটি দিয়ে মুত্র ত্যাগ করতে বসল। কিন্তু মুত্র ত্যাগ করতে রাবণের অনেক সময় লাগল।এদিকে ব্রাহ্মণবেশী বিষ্ণু লিঙ্গটি মাটিতে স্থাপন করল। এই স্থানেই এখন বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ অবস্থিত।রাবণ লিঙ্গটি মাটি থেকে তোলার অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু সে একচুলও সেটি নড়াতে পারল না। কি করবে ভেবে সে জোরে লিঙ্গটি নড়ানোর চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু বুড়ো আঙুলের আঘাতে লিঙ্গের একটুকরো অংশ ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কিছু করতে সে পারল না। পরে অনুতপ্ত হয়ে সে কৃতকর্মের জন্য শিবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল। এদিকে রাবণ যে শিবলিঙ্গটি লঙ্কায় নিয়ে যেতে পারল না, তা দেখে দেবতারা আনন্দিত হল।রাবণ লঙ্কায় ফিরে গেল। কিন্তু সে রোজ এসে সেই লিঙ্গটি পূজা করে যেত। এমনভাবেই সে সারাজীবন বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা করেছিল। যেখানে রাবণ পৃথিবীতে নেমে এসেছিলে সেটি বৈদ্যনাথ থেকে চার মাইল দূরে। হরিলাজোরি নামে একটি জায়গা বলে লোকে বিশ্বাস করে। লিঙ্গটি মাটিতে রাখা হয়েছিল অধুনা দেওঘর শহরে। লিঙ্গটি নাম বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ।

১০. নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ

এই জ্যোতির্লিঙ্গের অবস্থানও বিতর্কিত। জ্যোতির্লিঙ্গ দাবিদার মন্দিরগুলি হল উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার কাছে জাগেশ্বর মন্দির।গুজরাতের দ্বারকায় অবস্থিত মন্দির। ও অনেকের মতে এই মন্দির মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার অন্ধ নাগনাথে অবস্থিত।তবে সবচেয়ে বেশি লোক মনে করে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ভারতের গুজরাট রাজ্যে অবস্থিত।   আর এই মন্দির হিন্দুদের এক অন্যতম ধর্মীয় পীঠস্থান। গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত এই মন্দিরের শিবলিঙ্গকে বিশেষ মান্যতা দেওয়া হয়েছে।সমগ্র ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত দ্বাদশ জ্যোতির্লিংগের অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যানে এই মন্দির ঐতিহাসিক কাল থেকে ভক্তদের জন্য আকর্ষণের স্থল হয়ে আসছে। শিব উপাসকরা নাগেশ্বর মন্দিরের জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন পরম পবিত্র বলে গণ্য করে।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

শিব পুরাণ অনুসারে, এই অঞ্চলে পুরাকালে দারুক নামে এক রাক্ষস রাজত্ব করত। দারুকের উৎপাতে সব মানুষ পরিত্রাণের জন্য মধুসূদন কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়। দারুকের স্ত্রীর নাম ছিল দারুকী। দারুকী ছিল দেবী পার্বতীর উপাসিকা । পার্বতী দারুকীর প্রতি সন্ত্তষ্ট হয়। তিনি তাঁদের রাজত্ব করা অরণ্যটির নাম দারুকবন দেয়। সঙ্গে এই আশীর্বাদ  দেয় যে, দারুকী যেখান দিয়েই যাবে দারুকবনও সেই স্থান দিয়ে যাবে। পরবর্তী সময়ে দেবতারা দারুকের রাজ্য আক্রমণ করে।ফলে দারুক নিজ স্ত্রীকে পার্বতীর বরদান সুপ্রয়োগ করার জন্য আদেশ দেয়। সেই হিসাবে দারুকী সাগরতীর দিয়ে পালিয়ে যায়।এর ফলে দারুকবনও সেই জায়গা দিয়ে যায়। নিরাপদ স্থান থেকে দারুক আবার সকলের উপর অত্যাচার আরম্ভ করে। এবার দারুক সুপ্রিয় নামে একজন লোক এবং তাঁর সহচরদের অপহরণ করে বন্দী করে রাখে। সুপ্রিয় ছিল শিবের পরম উপাসক। সুপ্রিয় বন্দীগৃহে কিছুমাত্র চিন্তিত হয় না।সে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে মহাদেবের স্ত্ততি আরম্ভ করে। সুপ্রিয়র প্রার্থনায় সন্ত্তষ্ট হয়ে মহাদেব দর্শন দেয় । তিনি দারুককে বধ করার জন্য সুপ্রিয়কে অস্ত্র প্রদান করে। মহাদেবের বরদানে ধন্য হয়ে সুপ্রিয় দারুককে বধ করে। এর পর সুপ্রিয় মহাদেবকে সেই স্থানে বিরাজমান হয়ে থাকার জন্য অনুরোধ করে। মহাদেব নিজ জ্যোতি দ্বারা জ্যোতির্লিংগ স্থাপন করে নিজ ভক্তের মনোকামনা পূরণ করে। এই মন্দিরে মহাদেবকে নাগেশ্বর অর্থাৎ নাগ (সাপ)এর ঈশ্বর রূপে পূজা করা হয়। দেবী পার্বতী এই স্থানে নাগেশ্বরী রূপে বিরাজিতা আছেন বলে ভক্তরা বিশ্বাস করে।

১১. রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ

তামিলনাড়ুর রামেশ্বরে অবস্থিত এই  রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ চারধামের মধ্যে অন্যতম ধাম।একে দক্ষিণ ভারতের কাশীও বলা হয়।দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের শেষ প্রান্তভূমি পক প্রণালীতে একটি দ্বীপের আকারে গড়ে উঠেছে রামেশ্বরম। রামেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গটি বিশাল। এই মন্দিরে রামেশ্বর স্তম্ভ অবস্থিত।সারা বছর ধরেই অসংখ্য পুণ্যার্থী এখানে পূজা দিতে আসে।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

সীতাদেবীর বালুকা দ্বারা নির্মিত মূর্তি ও রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ স্থাপিত রয়েছে এই মন্দিরে। এই মন্দিরে নাকি দুটি লিঙ্গ আছে বলে মনে করা হয়।একটি সীতা পূজা করতেন।অন্যটি পূজা করতেন হনুমান।লঙ্কা জয় করে আসার পর এই পূজা করেন সীতা ও হনুমান।

১২. ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ

এটি ১২টি  জ্যোতির্লিঙ্গ এর মধ্যে শেষ জ্যোতির্লিঙ্গ।এই মন্দির এটি মহারাষ্ট্র  রাজ্যের আওরাঙ্গাবাদ থেকে ৩০ কিলোমিটার  দূরে এবং দৌলতাবাদ বা দেবগিরি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে  ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত।মন্দিরটি লাল পাথর দিয়ে তৈরি। এতে পাঁচটি চূড়া দেখা যায়। এখনকার মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি। এর গায়ে অনেক হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি খোদিত আছে।

মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা

পুরান অনুসারে, দক্ষিণ ভারতে দেবগিরি পর্বতে  সুধর্ম নামে এক ব্রাহ্মণ তাঁর পত্নী সুদেহাকে নিয়ে বাস করত। ব্রাহ্মণ দম্পতির সন্তান ছিল না।তাই সুদেহার মনে দুঃখ ছিল। সন্তানলাভের সবরকম চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছিল। সুদেহা তখন তাঁর বোন ঘুশ্মার সঙ্গে তাঁর স্বামীর বিবাহের প্রস্তাব দেয়। বোনের উপদেশ অনুসারে, ঘুশ্মা ১০১টি  শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে পূজা করে। সেগুলিকে সামনের হ্রদে বিসর্জন দেয়। শিবের আশীর্বাদে ঘুশ্মার একটি সন্তান হয়। এতে ঘুশ্মা অহংকারী হয়ে ওঠে। সুদেহা তাঁর বোনের প্রতি  ঈর্ষা বাড়ে।ঈর্ষার বশে সুদেহা একদিন ঘুশ্মার ছেলেটিকে খুন করে যে হ্রদে ঘুশ্মা শিবলিঙ্গ বিসর্জন দিয়েছিল, সেখানে দেহটি ফেলে দেয়। পরদিন সকালে ঘুশ্মা ও সুধর্ম উঠে ।পরে সুদেহাও উঠে রোজকার কাজ শুরু করে। ঘুশ্মার পুত্রবধূ অবশ্য তাঁর স্বামীর বিছানায় রক্তের দাগ দেখতে পায়। ভয় পেয়ে সে সব কথা তাঁর শাশুড়িকে বলে। ঘুশ্মা শিবের পূজায় নিযুক্ত ছিল। সে পূজার আসন ছেড়ে ওঠে না। এমনকি সুধর্মও ওঠে না। এমনকি রক্তের দাগ দেখেও ঘুশ্মার ভাবান্তর দেখা যায় না। সে বলে, ‘যিনি আমাকে পুত্র দিয়েছেন, তিনিই আমার পুত্রকে রক্ষা করবেন।’ এই বলে  সে শিবের নাম জপ করতে থাকে। তারপর শিবলিঙ্গ বিসর্জন দিতে গিয়ে ঘুশ্মা দেখে, তাঁর পুত্র আসছে। এতে ঘুশ্মা আনন্দিত বা দুঃখিত কিছুই হয় না। শিব তখন আবির্ভূত হয়ে বলেন, ‘তোমার ভক্তিতে আমি তুষ্ট হয়েছি। তোমার বোনই তোমার পুত্রকে হত্যা করেছিল।’ ঘুশ্মা তখন শিবকে অনুরোধ করেন সুদেহাকে ক্ষমা করে দিতে। শিব তাতে রাজি হন এবং ঘুশ্মাকে আরেকটি বর চাইতে বলেন। ঘুশ্মা বলে, ‘আপনি যদি অনন্তকাল এখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করেন, তাহলে আমি খুশি হব।’ ঘুশ্মার অনুরোধে শিব সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে অবস্থান করেন এবং ঘুশ্মার নামানুসারে এই লিঙ্গের নাম হয় ঘুশ্মেশ্বর বা ঘৃষ্ণেশ্বর। যে হ্রদে ঘুশ্মা শিবলিঙ্গ বিসর্জন দেয় সেই হ্রদটির নাম হয় শিবালয়।